অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সাফল্য, ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে দাপুটে সিরিজ জয়-সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সেই সাফল্যের রেশ ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। আবুধাবির তপ্ত আবহাওয়ায় এবার নতুন পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান, আর লড়াইয়ের আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বার্তা স্পষ্ট-অতীতের অর্জন নয়, নতুন কন্ডিশনে নিজেদের আরও এগিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য।
আজ আবুধাবিতে একমাত্র টেস্টে মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান। বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচে মাঠের প্রতিপক্ষের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে আবহাওয়াও। প্রচণ্ড গরমে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে টিকে থাকা, শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ বজায় রাখা-সব মিলিয়ে কঠিন পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে দুই দলের জন্য।
বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের বড় উৎস সাম্প্রতিক টেস্ট পারফরম্যান্স। সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া সফরে ডারউইনে দারুণ জয় তুলে নিয়ে সিরিজ ১-১ ব্যবধানে শেষ করেছে দল। তার আগে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে টাইগাররা। চলমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২৫-২৭ চক্রের পয়েন্ট টেবিলেও বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। যদিও আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই ম্যাচটি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ নয়, তবু দলের উন্নতির ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে যথেষ্ট।
সাম্প্রতিক সাফল্যে আত্মবিশ্বাস বাড়লেও প্রতিপক্ষ ও পরিবেশের ভিন্নতা নিয়ে সতর্ক শান্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া সাফল্যকে পেছনে ফেলে নতুন করে পরিকল্পনা সাজানোর ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হোসেন শান্ত জানিয়েছেন, ‘অস্ট্রেলিয়াতে ভালো সিরিজ গেছে আমাদের। তবে আমি বিশ্বাস করি সেই সিরিজ এখন অতীত হয়ে গেছে। এখানে নতুন প্রতিপক্ষ, নতুন কন্ডিশন। সেভাবেই প্ল্যান করতে হবে আমাদের। এখানে কন্ডিশন ভিন্ন। কিছু প্লেয়াররা প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছে। সেই ম্যাচ এখানে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। আমি বিশ্বাস করি প্লেয়াররা প্রস্তুত এবং কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিয়ে ভালো করবে।’
শুধু একটি সিরিজের ফল নয়, সামগ্রিকভাবে টেস্ট দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করাই এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য। গত কয়েক বছরে এই সংস্করণে উন্নতি হলেও আত্মতুষ্টির জায়গা দেখছেন না অধিনায়ক। বরং ভিন্ন কন্ডিশনে ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে একই মানের ক্রিকেট খেলার চ্যালেঞ্জটিকেই সামনে আনছেন তিনি।
শান্ত আরও জানিয়েছেন, ‘গত কয়েক বছরে এই ফরম্যাটে আমরা ভালো খেলছি। টেস্ট দল হিসেবে এগুলোই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা ঘরের মাঠে কঠোর পরিশ্রম করেছি উন্নতি করার জন্য। গত কয়েক বছরে ভালোই করছি আমরা। আমার মনে হয় স্কিল বাড়ানোর অনেক জায়গা আছে আমাদের। ভিন্ন কন্ডিশনে ভিন্ন প্রতিপক্ষের সাথে আমাদের ধারাবাহিক হতে হবে। আমরা ভালো করছি কিন্তু আরও উন্নতির জায়গা রয়েছে।’
আধুনিক ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা ও ব্যস্ত সূচির মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখাও বড় আলোচনার বিষয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিস্তার যেমন খেলাটির অর্থনৈতিক ও বিনোদনমূলক দিককে বদলে দিচ্ছে, তেমনি দীর্ঘ সংস্করণের গুরুত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন সময়ে। তবে শান্তর কাছে টেস্ট ক্রিকেটের আবেদন আলাদা। ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই এই সংস্করণে খেলার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। সুযোগ বাড়লে খেলোয়াড়দের টেস্টের প্রতি আগ্রহও আরও বিকশিত হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের রমরমা পরিস্থিতিতে টেস্ট খেলার অনুপ্রেরণা নিয়ে শান্তর বক্তব্য, ‘এখন কাজটা কঠিন। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে বড় হওয়ার সময়েই আমরা সবাই চেয়েছি টেস্ট ক্রিকেট খেলতে। ক্রিকেটারদের জিজ্ঞেস করলেও এই জবাবই পাবেন, সবাই টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চেয়েছে। টেস্ট ক্রিকেট সবার জন্য অনেক বিশেষ কিছু। যদি বেশি বেশি ম্যাচ খেলতে পারি, সব প্রতিপক্ষের সাথে, ব্যাপারটা ভালো হবে। সীমিত ওভারের ম্যাচও আছে। তবে সবাই টেস্ট খেলতেই বেশি ভালোবাসে। আমি সীমিত ওভারের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলতেই বেশি পছন্দ করব।’
টেস্টের প্রতি এই ভালোবাসাকে ধরে রাখার পাশাপাশি বর্তমান ক্রিকেটের বাস্তবতাও স্বীকার করছেন শান্ত। তাঁর মতে, তরুণ ক্রিকেটাররা তিন সংস্করণেই খেলতে চায়। টি-টোয়েন্টির প্রতি আগ্রহ থাকলেও টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গুরুত্ব কমে যায় না। বরং সব সংস্করণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে খেলোয়াড়দের দক্ষতা নিয়মিত শাণিত রাখতে হবে।
অধিনায়ক আরও বলেছেন, ‘টেস্ট ক্রিকেট বিশেষ কিছু। তরুণরাও চায় টেস্ট খেলতে। বিশ্ব ক্রিকেট যেভাবে আগাচ্ছে সবাই সীমিত ওভারের ক্রিকেটও খেলতে চায়। তরুণরা আসলে তিন ফরম্যাটই খেলতে চায়, যদিও টি-টোয়েন্টি বেশি খেলতে চায়। এটা ভিন্ন ব্যাপার। তবে টেস্ট ক্রিকেট বা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আসলে সবাই খেলতে আগ্রহী থাকে। বর্তমান সময়ে এসে সব ফরম্যাটের জন্যই স্কিল ঝালিয়ে রাখতে হবে।’
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি দুই দলের জন্যই দীর্ঘ সংস্করণে নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের উপলক্ষ। দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক ভালো থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। গত বছর আবুধাবিতে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। এবার অবশ্য সংস্করণ আলাদা, চ্যালেঞ্জও ভিন্ন। দীর্ঘ বিরতির পর দুই দলের টেস্ট লড়াই হওয়ায় ম্যাচটি ঘিরে বাড়তি আগ্রহ রয়েছে।
আফগানিস্তান টেস্ট নিয়ে শান্ত বলেন, ‘আমাদের দুই বোর্ডের মাঝে ভালো সম্পর্ক আছে। গত বছর এখানে (ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি) সিরিজ খেলেছি। এবার ভিন্ন ফরম্যাট। দীর্ঘদিন পর আমরা দুই দল (আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ) টেস্ট ক্রিকেট খেলছি। আমরা বেশ এক্সাইটেড। দুই দলই এখানে লড়াই করতে চাই এবং জিততে চায়। বাংলাদেশ দল ভালো প্রস্তুতি নিয়ে এখানে এসেছে এবং আমি বিশ্বাস করি এখানে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারব।’



