বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম শুধু কীর্তির জন্য নয়, একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করার কারণেও বিশেষ হয়ে ওঠে। আব্দুস সাদেক ছিলেন তেমনই এক নাম। দেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি যেমন ইতিহাসের অংশ, তেমনি ফুটবল মাঠ, কোচিং বেঞ্চ এবং ক্রীড়া প্রশাসনের টেবিলেও রেখে গেছেন অমলিন ছাপ। সেই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ শনিবার সকালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন হারাল এমন একজন মানুষকে, যার জীবনই ছিল দেশের খেলাধুলার বিকাশের এক জীবন্ত দলিল!
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন আব্দুস সাদেক। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনের লড়াইয়ে আর জয়ী হওয়া হলো না।
শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই ক্রীড়াঙ্গনে নেমে আসে শোকের আবহ।
আব্দুস সাদেকের ক্রীড়া জীবন শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন উপমহাদেশের খেলাধুলার মানচিত্রে প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র এবং সুযোগ ছিল সীমিত। সেই বাস্তবতায় নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের জোরে জায়গা করে নিয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে। ১৯৬৯ সালে ইউরোপ সফরে অংশ নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক হকিতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে তার পারফরম্যান্স প্রশংসিত হয়েছিল সমানভাবে সতীর্থ ও দর্শকদের কাছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর নতুন পতাকার নিচে ক্রীড়ার নতুন পরিচয় গড়ে তোলার যে প্রয়াস শুরু হয়, সেখানে সামনের সারির সৈনিক ছিলেন আব্দুস সাদেক। জাতীয় হকি দলের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং নতুন দেশের ক্রীড়া পরিচয়েরও প্রতীক ছিল।
তার নেতৃত্বেই ১৯৭৮ সালের ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে অংশ নেয় বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হকির প্রথম উপস্থিতির সেই অধ্যায় আজও দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে গৌরবের অংশ হয়ে আছে।
তাঁর অসাধারণত্বের আরেকটি বড় দিক ছিল বহুমুখী প্রতিভা। বর্তমান সময়ে যেখানে একজন খেলোয়াড় একটি খেলাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন, সেখানে আব্দুস সাদেক ছিলেন ব্যতিক্রম। হকির পাশাপাশি ফুটবল ও ক্রিকেটেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আবাহনীর প্রথম ফুটবল অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ক্লাবটির ইতিহাসেও নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে রেখেছেন।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেও ক্রীড়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হয়নি। বরং নতুন ভূমিকায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার উপস্থিতি। ১৯৭৭ সালে আবাহনীর প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়ে তিনি এমন এক দল গড়ে তোলেন, যা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। তার অধীনে আবাহনী পুরো মৌসুমে অপরাজিত থেকে লিগ শিরোপা জেতে। স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবলে এটি ছিল প্রথম অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘটনা, যা আজও বিশেষ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশিক্ষক হিসেবে সাফল্যের পর সংগঠক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের হকিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিত করার উদ্যোগ নেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া কাপ হকি। সেই আয়োজন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আব্দুস সাদেকের জীবনকে আলাদা করে দেখার আরেকটি কারণ তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট আব্দুস সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ আমলের খ্যাতিমান সাঁতারু। ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা তিনি পরিবার থেকেই পেয়েছিলেন। সেই উত্তরাধিকারকে তিনি শুধু ধারণই করেননি, বরং আরও সমৃদ্ধ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন।
দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৬ সালে তাকে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কিন্তু পুরস্কারের সংখ্যার চেয়ে বড় ছিল তার প্রভাব। বাংলাদেশের হকি যখন নিজের অবস্থান খুঁজছিল, ফুটবল যখন পেশাদারিত্বের পথে হাঁটতে শুরু করছিল, তখন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আব্দুস সাদেক ছিলেন সক্রিয় উপস্থিতি।










Discussion about this post