একটি বিশ্বকাপ, একটি সিদ্ধান্ত এবং তার পর দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। কেন বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশ খেলল না-এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে। নিরাপত্তা শঙ্কাকে সামনে রেখে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কার ভূমিকা ছিল, সেটি নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। এবার সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নেওয়া সেই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও (বিসিবি) আপত্তি জানায়নি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ২২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক মাসের তদন্ত শেষে কমিটি জানিয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না যাওয়ার জন্য মূলত দায়ী ছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সে সময়ের সরকার।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, ‘তদন্তে যা উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সবকিছু মিলিয়ে যা বলা যায়, যে মানুষটি দায়ী (বিশ্বকাপে না যাওয়ার জন্য), তিনি হলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপেদষ্টা আসিফ নজরুল। সেই সময়ের সরকার ও তিনি দায়ী।’
তদন্ত কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি কেবল সরকারের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে নেওয়া হয়নি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিকে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। তবে বিসিবি ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করেনি।
বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত কমিটির মূল্যায়নও ছিল পরিষ্কার। ফয়সাল বলেন, ‘বাংলাদেশের অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত ছিল।’
ঘটনার শুরু হয়েছিল নিরাপত্তা শঙ্কাকে কেন্দ্র করে। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় এবং তার জায়গায় স্কটল্যান্ডকে নিয়ে আয়োজন এগিয়ে যায়। কিন্তু সিদ্ধান্তটি নেওয়ার পর থেকেই এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
দেশের ভেতরেও এ নিয়ে তৈরি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে না খেলার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি অনেক ক্রীড়াপ্রেমী। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদও আসে বিভিন্ন মহল থেকে। নিরাপত্তা শঙ্কাই কি সত্যিকার কারণ ছিল, নাকি সিদ্ধান্তের পেছনে আরও কোনো বিষয় কাজ করেছিল-সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তের উদ্যোগ নেয় বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মার্চে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অণুবিভাগ) কে এম অলিউল্ল্যাকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন এবং আইনজীবী ফয়সাল দস্তগীর।
তদন্তের সময় কমিটি কথা বলেছে ক্রিকেটার, বিসিবির কর্মকর্তা, সাবেক ক্রিকেট প্রশাসক, কোচ, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে। ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ক্রিকেটারদের মধ্যে ছিলেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
ক্রিকেট প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও নেওয়া হয় বক্তব্য। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি, জাতীয় দলের কোচ ও সে সময়ের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং সে সময়ের বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন।
যুব ও ক্রীড়া সচিব মোঃ মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্যও নিয়েছে কমিটি। পাশাপাশি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে কীভাবে এসেছে, তা বোঝার জন্য বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে।



