বাংলাদেশের ক্রিকেটে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে লাল বলের ক্রিকেটে। একসময় যেখানে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে ধীরগতির, স্পিননির্ভর এবং কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে সমালোচনা করা হতো, সেখানে এখন দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। জাতীয় দলে পেসারদের উত্থান, বিদেশের মাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট এবং ব্যাটারদের টেকনিক্যাল উন্নতির পেছনে ঘরোয়া ক্রিকেটের এই পরিবর্তনকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অন্তর্বর্তী কমিটির সদস্য নান্নু জানিয়েছেন, গত সাত বছর ধরে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হয়েছে। শুধু নিয়মের পরিবর্তন নয়, পিচ, বল এবং ম্যাচ পরিচালনার ধরণেও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার।
নান্নু বলেন, ‘আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে কীভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা যায়, তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট কাজ করেছি। মাঠ ও পিচের প্রতিটি জায়গায় ঘাসের ৬ মিলিমিটার বজায় রাখা এবং বলের ধরনে পরিবর্তন আনা হয়েছে।’
নান্নু মনে করেন, দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা ছিল পিচের চরিত্র। ব্যাটিং সহায়ক ও স্পিননির্ভর উইকেটে খেলে খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারছিলেন না। সেই বাস্তবতা বদলাতে ঘাসযুক্ত উইকেট তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পেসাররা যেমন সহায়তা পাচ্ছেন, তেমনি ব্যাটারদেরও টেকনিক নিয়ে আরও সচেতন হতে হচ্ছে।
বল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন তিনি। আগে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোকাবুরা বল ব্যবহার করা হলেও এখন সেখানে চালু হয়েছে ডিউক বল। নান্নুর মতে, এই বল বেশি সুইং করে এবং ব্যাটারদের প্রকৃত দক্ষতা যাচাইয়ে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, ‘কোকাবুরা বলের পরিবর্তে আমরা ডিউক বল প্রবর্তন করেছি, যা তুলনামূলক বেশি সুইং করে এবং এতে ব্যাটারদের স্কিল বা দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ থাকে।’
শুধু বল নয়, নতুন বল ব্যবহারের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ৭৫ ওভার পর নতুন বল নেওয়া ঐচ্ছিক ছিল। এখন সেটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে দিনের শেষ ভাগেও পেসাররা নতুন বল হাতে আক্রমণে নামতে পারছেন।
নান্নুর মতে, ‘এই নতুন পদ্ধতির কারণেই ফাস্ট বোলাররা ম্যাচের শেষ দিকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, যা আমাদের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম কারণ।’
তিনি মনে করেন, একসময় দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অতিরিক্ত পুরোনো বল ব্যবহার করা হতো। ফলে স্পিনারদের দীর্ঘ সময় টানা বোলিং করতে দেখা যেত এবং পেসারদের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে যেত। নতুন সংস্কৃতিতে সেই ধারা বদলেছে। এখন পেসারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘ সময় বোলিং করার মানসিক শক্তিও বেড়েছে।
নান্নু বলেন, ‘ফাস্ট বোলাররা সারাদিন মাঠে থাকার পরও শেষ বিকেলে বোলিং করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।’
তবে মাঠের উন্নয়নই শেষ কথা নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এখনও অনেক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। কোচ নিয়োগ থেকে শুরু করে দল পরিচালনা-অনেক কিছুই এখনও আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো ম্যাচের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে কোচ নির্ধারণ করার মতো অবস্থায় আছি। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।’
এই বাস্তবতা বদলাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বিসিবির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ কমিটিগুলো যেন ধারাবাহিকভাবে একই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, সেজন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে বোর্ড সভাপতি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজ মাঠ ও প্রতিপক্ষের মাঠে খেলার পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মূল দলের পাশাপাশি শক্তিশালী দ্বিতীয় দল গঠনের ভাবনাও আছে। নান্নুর মতে, এতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে এবং ক্রিকেটারদের প্রস্তুতিও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট দলগুলোর ব্যবস্থাপনা অন্তত দুই বছরের জন্য স্থায়ী করা, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে সবকিছুর দেখাশোনা করতে পারে।’
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বয়সভিত্তিক ক্রিকেটকেও একই কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এতে খেলোয়াড়দের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন নান্নু।
এর পাশাপাশি আসন্ন বিসিবি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন তিনি। নান্নু বলেন, ‘আমাদের যে তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, তার আগেই আমরা নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আশা করছি মেয়াদের ২০-২৫ দিন আগেই নির্বাচন সম্পন্ন হবে এবং নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করবে। আমি নির্বাচন করব এটি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত।’










Discussion about this post