একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেট মানেই ছিল সাকিব আল হাসান। দেশের সবচেয়ে বড় ম্যাচ, সবচেয়ে বড় আশা কিংবা সবচেয়ে বড় ভরসা-সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলেন তিনি। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই মানুষটিই এখন জাতীয় দলের বাইরে, দেশের বাইরেও। ক্রিকেট এখনও তার জীবনের অংশ, কিন্তু বাংলাদেশ দলের জার্সিটা যেন ধীরে ধীরে দূরের কোনো স্মৃতি হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের পরিস্থিতি বদলে যায়, আর সেই বদলের সঙ্গেই পাল্টে যায় সাকিবের বাস্তবতাও। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আর দেশে ফেরা হয়নি তার। এরপরও পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় বলবেন। কিন্তু সেই বিদায়ও আর নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা দিয়ে দুবাই পর্যন্ত এসেও নিরাপত্তা শঙ্কায় ফিরে যেতে হয়েছিল তাকে। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মতোই অসমাপ্ত থেকে যায় সেই অধ্যায়।
দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকা একজন ক্রিকেটারের ভেতরে কী চলে-সেটা হয়তো সবচেয়ে ভালো জানেন তিনি নিজেই। জাতীয় দলের খেলা মিস করেন কি না, সেই প্রশ্নে সাকিবের কণ্ঠে ছিল বাস্তবতা আর আবেগের মিশ্রণ। তিনি বলেন, ‘ সেটা তো যে কেউই মিস করবে। ধরুন, এই যে মুশফিক ভাই, বা আরও আগের হাবিবুল বাশার সুমন ভাইয়ের কথা যদি বলি, যারা জাতীয় দলে খেলেছেন, দল থেকে বেরিয়ে প্রত্যেকেই সেটা মিস করেন, এটাই স্বাভাবিক। এটা একটা বিশেষ জায়গা।’
তবে মজার বিষয় হলো, জাতীয় দলের বাইরে থাকার কষ্ট থাকলেও হতাশাকে নিজের ওপর ভর করতে দিতে চান না তিনি। বরং এক ধরনের অভ্যাসের কথাই বললেন সাবেক এই অধিনায়ক। তার ভাষায়, ‘সেটা তো অবশ্যই ভিন্ন। তবে আফসোস কখনো লাগেনি। টেলিভিশনে দলের খেলা দেখেও কখনো মনে হয় না যে আমি তো খেলছি না! কয়েকবার সাসপেন্ড-টাসপেন্ড হয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে মনে হয়। ওইটা মিস করি না। হ্যাঁ, খেলতে পারছি না, এটার কষ্ট তো আছেই।’
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আগের প্রশাসনের সময় তাকে দেশে ফেরানোর আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু বোর্ড পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ থেমে যায়। বর্তমানে বিষয়টির অবস্থান নিয়ে সাকিব বলেন, ‘কোনো অবস্থায় নেই। আমি আইনগতভাবে যা করা সম্ভব করছি। আশা করি, অন্তত একটা বিষয় খুব তাড়াতাড়ি সমাধান হয়ে যাবে। খুবই তাড়াতাড়ি। এরপর থাকবে দুইটা কেস।’
জাতীয় দলের হয়ে তার শেষ ম্যাচ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, ভারতের কানপুরে। তারপর আর লাল-সবুজ জার্সিতে দেখা যায়নি তাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত করেননি। বরং সামনে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপকে ঘিরে এখনও স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে সাকিব বলেন, ‘এটা তো বিসিবির সিদ্ধান্ত। টিম ম্যানেজমেন্ট বা নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত। আমি খেলার মতো আছি কিনা, তারা আমাকে বিবেচনা করছে কিনা বা দলে অবদান রাখার মতো অবস্থায় আছি কি না।’
একই সঙ্গে তিনি পরিষ্কার করেছেন, তার মূল লক্ষ্য এখন ওয়ানডে ক্রিকেট। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায় নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও আছে তার। সাকিব বলেন, ‘টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট এত চিন্তা নাই। একটা সিরিজ খেলে শেষ করতে পারলে ভালো লাগবে। যেহেতু সামনের বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপ আছে, বিসিবির যদি পরিকল্পনা থাকে এবং সব এই বছর ঠিক হয়ে যায়, ওয়ানডে বিশ্বকাপ একটা সম্ভাবনা হতে পারে।’
জাতীয় দলে ফেরার পথটা যে সহজ নয়, সেটা নিজেও জানেন তিনি। তাই দেশে ফিরে বিপিএলে খেলে নিজের সামর্থ্য আবারও প্রমাণ করতে চান। তার ভাষায়, ‘এগুলো সব যদি-কিন্তুর ওপর নির্ভর করছে। গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবে না। এ বছরে ফিরতে পারলে, বিপিএল খেললে ভালো করলে, ভালো কারণ থাকবে আমাকে জাতীয় দলের জন্য চিন্তা করার।’
সাম্প্রতিক সময়ে নিজের ফিটনেস নিয়েও কাজ শুরু করেছেন সাকিব। যদিও স্বীকার করেছেন, খেলার বাইরে দীর্ঘ বিরতিতে ওজন কিছুটা বেড়ে গেছে। তবে আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি নেই। কারণ পারফরম্যান্স এখনও তাকে বিশ্বাস জোগায়। তিনি বলেন, ‘আত্মবিশ্বাস আসতো না যদি পারফরম্যান্স খারাপ হতো। সর্বশেষ আইএলটি-২০ তেও ভালো খেলেছি আলহামদুলিল্লাহ। এমন যদি হতো ভালো খেলছি না বা লিগগুলোতে দলগুলো আমাকে চাচ্ছে না। তখন আত্মবিশ্বাস থাকত না।’








Discussion about this post