বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোস্টারবয় সাকিব আল হাসান এখন যেন মাঠের চেয়ে বেশি আলোচনায় মাঠের বাইরের জীবন নিয়ে। একসময় যিনি ব্যাট-বল হাতে দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সাকিবই এখন দেশে ফেরাকে দেখছেন অনিশ্চয়তা আর শঙ্কার চোখে। মামলা, নিরাপত্তা, রাজনীতি ও জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা-সবকিছু নিয়ে দীর্ঘ নীরবতার পর এবার খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি!
সাবেক এই অধিনায়কের সবচেয়ে আলোচিত দাবি এসেছে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলা ঘিরে। সাকিব জানিয়েছেন, মামলার তালিকা থেকে নাম সরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল।
সাকিব বলছিলেন, ‘বলেছে, এক কোটি টাকা দিলে আমার নাম কেস থেকে উঠিয়ে দেবে। কিন্তু যারা বলছে, তাদের ধারণা নেই যে কেস হয়ে যাওয়ার পর চাইলেই নাম উঠানো যায় না। শেষ পর্যন্ত পুলিশের তদন্তেই ঠিক হবে আমার সম্পৃক্ততা ছিল কি না।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে একের পর এক মামলা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে হওয়া মামলার তালিকায় নাম আসে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়া সাকিব আল হাসানেরও।
সাকিব জানিয়েছেন, মামলার বাদীপক্ষের সঙ্গে যুক্ত একজন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন অন্যদের মাধ্যমে। যদিও সেই ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘এফআইআরে বাদীপক্ষে যার নাম আছে যোগাযোগ করার জন্য, তিনি দু-একজনের মাধ্যমে যোগাযোগটা করেছেন। কাদের মাধ্যমে, আমি তাদের নাম বলতে চাচ্ছি না।’
অর্থের বিনিময়ে সমস্যা মেটানোর প্রস্তাবকে শুরু থেকেই অস্বস্তিকর মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সাকিবের কথায়, ‘এসব টাকা দিয়ে কেন করতে হবে ভাই? টাকা দেওয়া মানে তো হচ্ছে আমার সমস্যা আছে, আমি চাচ্ছি যে আমাকে এখান থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হোক। হতে পারে তারা ভেবেছে আমার কাছে অনেক বেশি টাকা, চাইলেই হলো।’
তবে মামলা যতটা না ভাবাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে দেশে ফেরার পরের পরিস্থিতি। সাকিব স্পষ্ট করেই বলেছেন, দেশে ফিরতে আইনগত বাধা নেই। কিন্তু তিনি চান নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
তিনি বলেন, ‘আমি চাই স্বাভাবিক একটা নিরাপত্তা এবং দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাক। এ দুটি বিষয় আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা না ওঠানো পর্যন্ত আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়।’
গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় নেই বললেও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তিনি। তার ভাষায়, ‘মব হতে পারে, ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকেও কিছু হতে পারে। অন্তত এমন একটা জায়গা তো থাকা উচিত, যেখানে বিপদ হলে কেউ দায়িত্ব নেবে।’
সাকিবের কথায় স্পষ্ট, দেশের বর্তমান বাস্তবতা তাকে মানসিকভাবে নাড়া দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন খানিকটা হতাশা আর বিস্ময়ের সুরে।
তিনি বলেন, ‘একটা সময় দেখতাম সবাই আওয়ামী লীগ করে, আর এখন দেখি যে কেউ আওয়ামী লীগ করে না।’
রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েও অবশ্য অনুতপ্ত নন তিনি। বরং মনে করেন, মানুষ অনেক সময় পরিস্থিতি বদলালে মত বদলায়।
সাকিব বলেন, ‘আজকে যেটা ঠিক মনে হয় না, পাঁচ বা দশ বছর পরে হয়তো সেটাই ঠিক মনে হবে। মানুষ বারবার ভুলে যায় যে, আমি একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলাম। এলাকার মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছেন দেখেই আমি জিতেছি। তারা যদি ভোট না দিতেন, আমি জিততাম না। সারা দেশের মানুষ তো আমাকে ভোট দেননি।’
ক্রিকেটেও এখনো শেষ দেখছেন না এই অলরাউন্ডার। জাতীয় দলের হয়ে আবারও মাঠে নামার ইচ্ছা আছে তার। বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান তিনি।
২০২৭ বিশ্বকাপের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সাকিব বলেন, ‘সুযোগ পেলে আবার নিজেকে প্রস্তুত করতে চাই। এক-দুটি সিরিজ খেললে তখন বোঝা যাবে আমি কোথায় আছি, দলও বুঝতে পারবে।’
বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন সাকিব। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে কাটানোর পর দেশে ফেরার প্রসঙ্গ উঠতেই যেন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ান তিনি। মিরপুর স্টেডিয়াম নাকি নিজের শহর মাগুরা-কোথায় আগে যাবেন, এমন প্রশ্নে তার উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ, ‘এখন তো ঢাকায় পা রাখাটাই বড় চিন্তা।’









Discussion about this post