বছরের মার্চ-এপ্রিল, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এই সময়টাতেই সাধারণত মাঠে গড়ায় ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ, যেখানে দেশের শতাধিক ক্রিকেটার নিজেদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি জীবিকার বড় একটি অংশ নিশ্চিত করেন। কিন্তু এবার সেই পরিচিত দৃশ্য নেই। মাঠে নেই ব্যাট-বলের লড়াই, বরং চারপাশে বিরাজ করছে এক ধরনের অস্বাভাবিক নীরবতা এবং অনিশ্চয়তা।
এই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা লিগ, যা এখনো শুরু হয়নি এবং আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং ঢাকার ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব, বিশেষ করে সর্বশেষ নির্বাচনকে ঘিরে মতবিরোধ। এই টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসরে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই লিগ মাঠে গড়ানোর উদ্যোগ নিতে চাইছে বোর্ড। এ লক্ষ্যে ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস আগামী ৮ এপ্রিল ঢাকার সব ক্লাবকে নিয়ে একটি বৈঠকের ডাক দিয়েছে। মিরপুরে নির্ধারিত এই বৈঠককে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ক্লাব সংগঠকরা এতে কীভাবে সাড়া দেবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অচলাবস্থার মধ্যে ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে সরব হয়েছে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। সংগঠনটি এরই মধ্যে বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং সিসিডিএম চেয়ারম্যান আদনান রহমান দীপন বরাবর চিঠি দিয়ে দ্রুত লিগ শুরুর আহ্বান জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্রিকেটারদের হতাশা প্রকাশ এই সংকটের গভীরতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ঢাকা লিগের গুরুত্ব শুধু প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের বিপুলসংখ্যক ক্রিকেটারের প্রধান আয়ের উৎস। জাতীয় দলের বাইরে থাকা অধিকাংশ খেলোয়াড় এই লিগের ওপরই আর্থিকভাবে নির্ভরশীল। ফলে লিগ বন্ধ থাকায় তাদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। অনেকেই এখন কঠিন সময় পার করছেন, যা ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে।
এই বাস্তবতায় কোয়াব নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে ক্রিকেটারদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। সংগঠনটি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগের ক্রিকেটারদের মধ্য থেকে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো মনোনয়ন নয়, বরং খেলোয়াড়দের ভোটেই নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে। এতে তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ ও মতামত আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন মনে করেন, বর্তমান সংকটকালই এই উদ্যোগ নেওয়ার উপযুক্ত সময়। তার ভাষায়, ঢাকা লিগ বন্ধ থাকায় খেলোয়াড়রা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং বিষয়টি সংগঠনের নজরে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, লিগ চালু করতে কোয়াব বিসিবি ও সিসিডিএমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে।
প্রিমিয়ার লিগে খেলা ১২টি ক্লাবকে বৈঠকের জন্য চিঠি দিয়েছে বিসিবি। যদিও নির্বাচনে অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগে বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে ‘অবৈধ’ দাবি করে প্রিমিয়ার লিগসহ সিসিডিএমের অধীন সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের অবস্থান নিয়েছে ঢাকার ক্লাবগুলোর বড় অংশ।
এই সংকট শুধু একটি টুর্নামেন্ট স্থগিত হওয়ার ঘটনা নয়; এটি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে একটি লিগ বন্ধ হয়ে গেলে শত শত ক্রিকেটারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে, সেখানে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এখন দৃষ্টি ৮ এপ্রিলের বৈঠকের দিকে। এই বৈঠক থেকে কোনো সমাধান বেরিয়ে আসবে কি না, সেটিই নির্ধারণ করবে ঢাকা লিগের ভবিষ্যৎ। একই সঙ্গে এটি বোঝা যাবে, বিসিবি, ক্লাব সংগঠক এবং ক্রিকেটারদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি কতটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।










Discussion about this post