মিরপুরের সন্ধ্যায় যেন জমে উঠেছিল এক আবেগের গল্প। তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরিতে শুরু, শেষে বোলারদের দৃঢ়তায় পূর্ণতা, ১১ রানে এই নাটকীয় ম্যাচ জিতেই ১১ বছর পর পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচে রোমাঞ্চ ছড়ানো লড়াই শেষে জয় তুলে নেয় স্বাগতিকরা। সেই জয়ের মধ্য দিয়েই তিন ম্যাচের সিরিজ ২–১ ব্যবধানে নিজেদের করে নেয় মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বাধীন দল।
ম্যাচের শুরুতে ব্যাট হাতে শক্ত ভিত গড়ে দেয় বাংলাদেশ। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৯০ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায় স্বাগতিকরা। বড় এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে পাকিস্তান। জবাবে নেমে ৫০ ওভারে অলআউট হয়ে পাকিস্তান করে ২৭৯ রান।
বাংলাদেশি পেস আক্রমণের সামনে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারীরা। তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানাদের বোলিংয়ে মাত্র ২.৫ ওভারে ১৭ রানের মধ্যেই ৩ উইকেট হারিয়ে বসে পাকিস্তান। দ্রুত উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কায় পড়ে তারা।
তবে সেখান থেকেই লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করে পাকিস্তান। সালমান আগা ও আব্দুল সামাদ ধৈর্য নিয়ে ইনিংস গড়ে তোলেন। দুজন মিলে চাপ সামলে স্কোরবোর্ড এগিয়ে নিতে থাকেন। সামাদ ৩৪ রান করে আউট হলেও একপ্রান্তে দৃঢ়ভাবে ব্যাট করতে থাকেন সালমান। পরে শাদ মাসুদ ৪৪ বলে ৩৮ রান করে কিছুটা সঙ্গ দেন তাকে।
এক প্রান্তে উইকেট পড়লেও পাকিস্তানের আশা জিইয়ে রাখেন সালমান আগা। ধীরে ধীরে শতকের দিকে এগিয়ে যান তিনি এবং শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি তুলে নেন। তার এই ইনিংসে ম্যাচটি আবারও জমে ওঠে এবং বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিরোধ ভেঙে দিতে সক্ষম হয় বাংলাদেশি বোলাররা। সালমান আগার শতকও পাকিস্তানকে জয়ের পথে নিতে পারেনি। ফলে শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা পেরিয়ে জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ এবং সিরিজও নিজেদের করে নেয়।
এর আগে দিনের শুরুতে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি। ব্যাট করতে নেমে আত্মবিশ্বাসী শুরু এনে দেন দুই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও সাইফ হাসান। পাওয়ার প্লের প্রথম দশ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৫০ রান তোলে বাংলাদেশ।
পরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তানজিদ। চার-ছক্কার ঝড় তুলে দ্রুত অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। উদ্বোধনী জুটিতে সাইফ হাসানের সঙ্গে ১০৫ রান যোগ করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। সাইফ ৩৬ রান করে আউট হলেও নিজের ছন্দ ধরে রাখেন তানজিদ।
নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুক্ষণ সঙ্গ দিলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। তবে অন্য প্রান্তে দাপটের সঙ্গে ব্যাটিং চালিয়ে যান তানজিদ। ইনিংসের ৩৩তম ওভারে সালমান আলী আগাকে ছক্কা মেরে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। ৯৮ বলে করা সেই শতকের পর হেলমেট খুলে দর্শকদের অভিবাদন জানান এবং পিচে সিজদা দিয়ে উদযাপন করেন।
তবে সেঞ্চুরির পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি। আবরার আহমেদের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে ১০৭ বলে ১০৭ রান করেন তানজিদ, যার মধ্যে ছিল ৬টি চার ও ৭টি ছক্কা। এরপর লিটন দাস ও তাওহীদ হৃদয়ের জুটিতে এগিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।
চতুর্থ উইকেটে তারা ৬৮ রান যোগ করেন। লিটন ৪১ রান করে আউট হলেও হৃদয় ৪৪ বলে ৪৮ রান করে অপরাজিত থাকেন। তাদের অবদানেই ২৯০ রানের লড়াই করার মতো সংগ্রহ দাঁড় করাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
সিরিজের শুরুটাও ছিল বাংলাদেশের দাপুটে জয় দিয়ে। প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানকে মাত্র ১১৪ রানে গুটিয়ে দিয়ে বড় জয় পেয়েছিল স্বাগতিকরা। যদিও দ্বিতীয় ম্যাচে হেরে সিরিজ সমতায় ফিরে আসে পাকিস্তান। তবে শেষ ম্যাচে আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে সিরিজ জয়ের আনন্দে ভাসে বাংলাদেশ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর-
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৯০/৫ (সাইফ ৩৬, তানজিদ ১০৭, শান্ত ২৭, লিটন ৪১, হৃদয় ৪৮*, রিশাদ ০, আফিফ ৫*; আফ্রিদি ১০-০-৫৫-১, রউফ ১০-০-৫২-৩, আবরার ১০-০-৪৯-১)।
পাকিস্তান: ৫০ ওভারে ২৭৯/১০ (সাহিবজাদা ৬, সাদাকাত ৬, ঘোরি ২৯, রিজওয়ান ৪, সামাদ ৩৫, সালমান ১০৪, মাসুদ ৩৮, ফাহিম ৯, আফ্রিদি ৩৭, রউফ ১, আবরার ০*; তাসকিন ১০-১-৪৯-৪, নাহিদ ১০-০-৬২-২, মুস্তাফিজ ১০-০-৫৪-৩)।
ফল: বাংলাদেশ ১১ রানে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: তানজিদ হাসান।
ম্যান অব দা সিরিজ: তানজিদ হাসান ও নাহিদ রানা।










Discussion about this post