ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জানাতে হবে বাংলাদেশ দল ভারতে খেলতে যাবে কি না। শুরু থেকেই এ ইস্যুতে বিসিবি সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে এবং সরকারের সিদ্ধান্তই আইসিসিকে জানানো হবে বলে বোর্ডের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবার রাতে বিসিবির নীতিনির্ধারকেরা যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে বৈঠক করেন। সরকারের অবস্থান আগেই পরিষ্কার,নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতকে ভেন্যু হিসেবে মেনে নিতে তারা রাজি নন। ক্রীড়া উপদেষ্টা একাধিকবার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে পাঠানোর পক্ষে সরকার নয়।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে খেলোয়াড়দের মতামত জানতে চান সরকার। সে কারণেই বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। সেখানে ভারতের মাটিতে গিয়ে খেলা কিংবা না খেলার বিষয়টি সরাসরি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে শোনা হবে।
এর আগে বুধবার আইসিসির সভায় বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাব ১২-২ ভোটে বাতিল হয়ে যায়। ওই ভোটাভুটিতে বাংলাদেশের পক্ষে কেবল পাকিস্তান সমর্থন দেয়। সভা শেষে আইসিসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারতেই আয়োজন করা হবে। আইসিসির যুক্তি, টুর্নামেন্ট এত কাছাকাছি সময়ে এসে ভেন্যু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, ভারতে নিরাপত্তাজনিত কোনো উদ্বেগের কারণ নেই।
আইসিসি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত ভারতে গিয়ে খেলতে না চায়, তাহলে ‘সি’ গ্রুপে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, স্কটল্যান্ড এই বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি; ইউরোপীয় বাছাইপর্বে তারা নেদারল্যান্ডস ও ইতালির পেছনে ছিল।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর ২০০৭ সাল থেকে প্রতিটি আসরেই অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। গত ১৯ বছরে কখনোই এই মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট মিস করেনি তারা। ফলে এবারের আসরে না খেলতে হলে তা বিসিবির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হবে। অন্যদিকে সরকার বারবার জানিয়ে আসছে, দেশের মর্যাদা ও নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ রয়েছে ‘সি’ গ্রুপে। ৭, ৯ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় তাদের তিনটি ম্যাচ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে শেষ ম্যাচ খেলার কথা। কিন্তু এই সূচি ঘিরেই দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে চলছে তীব্র আলোচনার ঝড়। বাংলাদেশ শুরু থেকেই জানিয়েছে, তারা ভারতের মাটিতে খেলতে যাবে না এবং শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানালেও আইসিসি তা সাফ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল পুরোপুরি আশা ছাড়েননি। আইসিসির প্রেস বিজ্ঞপ্তির কয়েক ঘণ্টা পর তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তার ভাষায়, আইসিসি হয়তো শেষ মুহূর্তে তাদের অবস্থান বদলাতে পারে। তিনি জানান, ভোটাভুটির আগে বিসিবি আইসিসি বোর্ডকে তাদের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছিল এবং তারা ভোটে যেতে চায়নি, নিজেরাই সরে দাঁড়িয়েছিল।
তবে সরকারকে কোনো ধরনের চাপ দিতে চান না বলেও স্পষ্ট করেছেন বিসিবি সভাপতি। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান তারা বোঝেন এবং শ্রীলঙ্কায় খেলার দাবিতেই বিসিবি অনড়। সরকারের মতামতই শেষ পর্যন্ত আইসিসিকে জানানো হবে বলে জানান তিনি, কারণ একটি সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কেবল খেলোয়াড়দের নয়, সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে।
সব মিলিয়ে ভারতের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন এক দিনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আজকের মধ্যেই সরকার ও বিসিবির অবস্থান চূড়ান্তভাবে আইসিসিকে জানাতে হবে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, টানা ২০ বছরের বিশ্বকাপ যাত্রা এবার অব্যাহত থাকবে, নাকি নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে থেমে যাবে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অধ্যায়।










Discussion about this post