মুশফিকুর রহিমের ক্রিকেট জীবনের সঙ্গে মাহবুব আলী জাকির নাম জড়িয়ে আছে শুরুর দিনগুলো থেকেই। অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে শুরু করে হাই পারফরম্যান্স ইউনিট, একাডেমি ও জাতীয় দল-প্রতিটি ধাপে এই কোচ ছিলেন তাঁর পাশে, ছিলেন অভিভাবকের মতো একজন মানুষ।
প্রায় ২৫ বছরের সেই সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে, যেখানে শেষবারের মতো গুরুতর শোকে ভেঙে পড়তে দেখা যায় মুশফিককে।
জাকির মৃত্যুসংবাদ আসে ম্যাচ চলাকালীন সময়ে। তখন ঢাকার বিপক্ষে ব্যাট করছিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। মাঠে খেলা চলায় কেউই তখন প্রকাশ্যে অনুভূতি জানাতে পারেননি। তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগের বাঁধ ভেঙে পড়ে। ঢাকা ও রাজশাহীর ক্রিকেটাররা একে একে নিজেদের শোক আর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে শুরু করেন।
মাঠে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর মাহবুব আলী জাকিকে কিছুক্ষণ সিপিআর দেওয়া হয় এবং দ্রুত সিলেটের আল হারামাইন হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসকরা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে তাঁর মরদেহ ফিরিয়ে আনা হয় সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।
সেই দিনই রাজশাহীকে ৫ উইকেটে হারায় ঢাকা ক্যাপিটালস। ম্যাচ শেষে দুই দলের ক্রিকেটার, কোচ ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মাঠেই অনুষ্ঠিত হয় জাকির প্রথম জানাজা।
জানাজার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন মুশফিকুর রহিম। চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি পেসার শরিফুল ইসলামসহ আরও অনেক ক্রিকেটার। কোচ তালহা জুবায়ের, হান্নান সরকার, খালেদ মাহমুদ সুজন ও রাজিন সালেহরা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাকির মরদেহের পাশে। ঢাকার অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন চেষ্টা করছিলেন নিজের আবেগ সংবরণ করতে, যদিও চোখেমুখে শোকের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
রাজশাহীর বিপক্ষে পাওয়া জয়টি প্রয়াত কোচকেই উৎসর্গ করেছে ঢাকা ক্যাপিটালস। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, ‘আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের খবর। জাকি স্যার মারা গেছেন। তার পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা ও দোয়া রইল। তবে একটি ভালো জয়। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি ক্ষতি। তিনি আমাদের কাছে অনেকটা বাবার মতো ছিলেন। আমি মনে করি, এটি আমাদের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। আমরা যখনই কোনো ম্যাচ খেলি, জেতার জন্যই খেলি। এই জয় আমি জাকি স্যারকে উৎসর্গ করছি। ইনশা আল্লাহ, আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করবেন।’
বিপিএলে জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ঢাকার ক্রিকেটারদের হৃদয় ছিল ভারাক্রান্ত। ম্যাচ শুরুর আগেই ঘটে যাওয়া এই বিয়োগান্তক ঘটনা পুরো দলের ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। খেলোয়াড়দের নিয়ে ওয়ার্ম-আপ চলাকালীন নির্দেশনা দিতে দিতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সহকারী কোচ মাহবুব আলী জাকি। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠ থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
জাকির প্রয়াণে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে শোকের মাতম চলছে। সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মর্তুজা, তাসকিন আহমেদ ও রিশাদ হোসেনসহ অনেক ক্রিকেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ঢাকা ক্যাপিটালস। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলসহ বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিসিবি সভাপতি তাঁর বক্তব্যে সবার কাছে জাকি স্যারের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করার আহ্বান জানান।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের হাই পারফরম্যান্স কোচ হিসেবে যোগ দেন মাহবুব আলী জাকি। ২০১৬ সালে তাসকিন আহমেদের বোলিং অ্যাকশন সংশোধনের পেছনে ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মাশরাফি বিন মর্তুজা ও তাসকিনসহ জাতীয় দলের বহু পেসারের মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচিং প্যানেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও পেস বোলিং কোচ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।










Discussion about this post