বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনীতির ইতিহাসে এমন ব্যক্তিত্ব খুব বেশি নেই, যাদের জীবন একাধিক ক্ষেত্রের সাফল্যে সমানভাবে উজ্জ্বল। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম) সেই বিরল নামগুলোর একটি। একসময় বল পায়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দেওয়া এই ফুটবলার আবার ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে হয়ে উঠেছিলেন দ্রুততম মানব। আর এখন তিনি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদে-জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে তার পরিচয় মূলত একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু অতীতে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম উজ্জ্বল ক্রীড়াবিদ। পাকিস্তান আমলে যখন বাঙালি খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া ছিল কঠিন, তখন নিজের যোগ্যতা ও দৃঢ়তার জোরে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, দলের অধিনায়কত্বও করেছেন এবং ১৯৬৮ সালের এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
স্বাধীনতার পর তার ফুটবল প্রতিভা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জার্সিতে খেলতে নেমে তিনি গোলের ঝড় তুলেছিলেন। এক ম্যাচে ‘ডাবল হ্যাটট্রিক’ করার বিরল কীর্তি আজও দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে। মাঠে তার উপস্থিতি মানেই ছিল প্রতিপক্ষের জন্য বাড়তি চাপ।
তবে তার ক্রীড়া প্রতিভা কেবল ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অ্যাথলেটিক্সেও তিনি ছিলেন সমান সফল। একাধিকবার পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্লু’ পদকও তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছিল সেই সময়েই।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পরও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং সংগঠক হিসেবে নতুন ভূমিকায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশের ফুটবল প্রশাসনে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। দেশের সীমানা পেরিয়েও তার উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সহসভাপতি এবং ফিফার আপিল ও শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন।
ফুটবলে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে ফিফা তাকে ‘অর্ডার অব মেরিট’ পদকে ভূষিত করে, যা বাংলাদেশের কোনো ফুটবল ব্যক্তিত্বের জন্য অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক সম্মান হিসেবে বিবেচিত হয়।
নব্বইয়ের দশকের পর থেকে রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সংসদ সদস্য হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। তবে ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশে অনেক ক্রীড়াবিদ বা ক্রীড়া সংগঠক পরবর্তীতে সংসদ সদস্য কিংবা ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদের বসার নজির আগে দেখা যায়নি। সেই অর্থে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের এই দায়িত্ব গ্রহণ কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসেও এক নতুন অধ্যায়।










Discussion about this post