টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ঘরোয়া ক্রিকেটে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের অবসান হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া সংকট এখনো কাটেনি। ভারতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে কি না এবং খেললেও কোথায় খেলবে-এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। বিশ্বকাপ শুরু হতে আর বেশি সময় না থাকায় পরিস্থিতির গুরুত্ব প্রতিদিনই বাড়ছে।
এই অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যেই আজ ঢাকায় পৌঁছাচ্ছেন আইসিসির দুই কর্মকর্তা। শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার ফলাফল শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো টুর্নামেন্ট ব্যবস্থাপনাতেই প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিসিবির পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে, বোর্ড এখনো তাদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। মিরপুরে বিসিবি পরিচালক ইফতেখার রহমান মিঠু বলেন, আইসিসির প্রতিনিধিরা ঢাকায় আসছেন ঠিকই, তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন বিসিবি সভাপতি ও সহসভাপতি। তিনি জানান, বোর্ড এই আলোচনায় ইতিবাচক কিছু প্রত্যাশা করছে।
গত ৪ জানুয়ারি নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিসিবি। এরপর থেকে সেই সিদ্ধান্তেই অনড় রয়েছে বোর্ড। বিসিবির মতে, খেলোয়াড়দের পাশাপাশি সাপোর্ট স্টাফ, গণমাধ্যমকর্মী এবং দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান বাস্তবতায় কঠিন। এই বিষয়টিই আইসিসির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে। বিসিবি সভাপতি নিজে সরাসরি বিষয়টি তদারকি করছেন।
আইসিসির এই সফরকে অনেকেই বিসিবিকে রাজি করানোর শেষ প্রয়াস হিসেবে দেখছেন। তবে এর পাশাপাশি এটিকে একটি সম্পর্ক রক্ষার উদ্যোগ বলেও বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে বিশ্ব ক্রিকেটের মূলধারায় বাংলাদেশ নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে না করে।
এর আগে গত মঙ্গলবার আইসিসির সঙ্গে এক ভিডিও বৈঠকে বসে বিসিবির শীর্ষ নেতৃত্ব। সেখানে বিসিবির পক্ষ থেকে আইসিসির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দল ভারতে গেলে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে নিরাপত্তা বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে এবং বাংলাদেশ দলের জার্সি পরে চলাফেরা করা সমর্থকদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিসিবির প্রশ্ন ছিল, এমন মূল্যায়নের পরও কীভাবে আইসিসি দল পাঠানোর ব্যাপারে অনড় থাকে। সেই বৈঠক থেকে কোনো সমাধান না এলেও আইসিসি পরবর্তীতে আবার আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আজকের আলোচনায় সরকারের প্রতিনিধিও যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
ক্রিকেট বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ক্রিকবাজ জানিয়েছে, এই সংকটের মূল ভিত্তি দুটি। প্রথমত, ভারতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত, মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে চলমান বিতর্ক ও সম্ভাব্য ঝুঁকি। দুবাই থেকে আসা আইসিসি কর্মকর্তারা বিসিবিকে বোঝাতে চাইবেন, বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া বাকি ১৯টি দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তাও আইসিসির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। সব পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আইসিসির দায়িত্ব।
ক্রিকবাজের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিসিবি সভাপতি নিরাপত্তা প্রতিবেদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মোস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তা নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ জানানো হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে বিজেপি ও শিবসেনা নেতাদের মন্তব্যের কথাও আলোচনায় এসেছে। আইসিসির বক্তব্য হলো, পরিস্থিতি জটিল হলে নিরাপত্তাব্যবস্থাও সেই অনুযায়ী আরও শক্তিশালী করা হবে।
অন্যদিকে, আইসিসি ও বিসিসিআই উভয়েই মনে করছে, টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে সূচি পরিবর্তন ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। আইসিসির মতে, সূচি পরিবর্তনের সময়সীমা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের ইচ্ছা, তারা শ্রীলঙ্কায় তাদের ম্যাচগুলো খেলবে। তবে ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের প্রথম তিনটি ম্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কলকাতায় এবং শেষ ম্যাচটি নেপালের বিপক্ষে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সূচিই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।










Discussion about this post