অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যাওয়ার আগে নিজের জন্য একটি লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। অন্তত দুবার পাঁচ উইকেট নিতে চান-এমন স্বপ্ন নাকি একা একাই কল্পনা করতেন বাংলাদেশের এই পেসার। ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সেই কল্পনার প্রথম অধ্যায়টা তিনি লিখলেন এমনভাবে, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটে আলাদা করে জায়গা করে নেবে!
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে আজ প্রথম দিনেই ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। হাসান মাহমুদের আগুনে বোলিংয়ের সঙ্গে তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেনের ধারালো পেস আক্রমণে মাত্র ৫৩ ওভারে ১৯৮ রানে অলআউট হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। আর এই ধসের কেন্দ্রে ছিলেন হাসান। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৫৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ছয় উইকেট।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটাই এখন সেরা বোলিং ফিগার। এর আগে এই কীর্তির তালিকায় ছিলেন মোহাম্মদ রফিক ও সাকিব আল হাসান। ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬২ রানে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন রফিক। ২০১৭ সালের মিরপুর টেস্টে সাকিব দুই ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন—৬৮ ও ৮৫ রানে।
হাসানের কীর্তি অবশ্য শুধু টেস্টের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। সব সংস্করণ মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের প্রথম পাঁচ উইকেটের নজির এটি। এতদিন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বোলারদের সেরা ছিল টেস্টে মাশরাফি বিন মুর্তজার তিন উইকেট, ওয়ানডেতে রুবেল হোসেনের এবং টি-টোয়েন্টিতে তাসকিন আহমেদের চার উইকেট। সবাইকে ছাড়িয়ে এবার নতুন রেকর্ড গড়লেন হাসান।
ডারউইনের উইকেটে হাসানের গল্পটাও যেন ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে। শুরুতে জেক ওয়েদারল্যান্ডকে অফ স্টাম্পের বাইরে বল করে বারবার প্রলুব্ধ করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদেই পা দেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার। হাসানের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন ওয়েদারল্যান্ড।
এরপর অতিরিক্ত বাউন্স ও মুভমেন্টে ট্রাভিস হেডকে বিভ্রান্ত করেন তিনি। খেই হারিয়ে নিজের স্টাম্পেই বল টেনে আনেন হেড। প্রথম স্পেলেই দুই উইকেট নিয়ে হাসান বুঝিয়ে দেন, দিনটি হতে পারে তাঁর।
মাঝের সময়ে তাসকিন ও ইবাদত চাপ ধরে রাখেন। দুজনেই তুলে নেন দুটি করে উইকেট। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে স্বস্তি ফেরার সুযোগ তৈরি হয়নি। মধ্যাহ্নভোজনের পর আবার আক্রমণে ফিরে হাসান। প্যাট কামিন্সকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে তৃতীয় উইকেট নেন। পরের ওভারেই একইভাবে মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন চার উইকেট।
চা বিরতির পরও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর আস্থার প্রতিদান দিতে সময় নেননি হাসান। তাঁর বাউন্সারে পুল করতে গিয়ে ক্যাচ দেন স্টিভ স্মিথ। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ ভাঙার পাশাপাশি হাসানের হাতে উঠে আসে কাঙ্ক্ষিত পাঁচ উইকেট। শেষ পর্যন্ত নাথান লায়নকে ফিরিয়ে ইনিংস শেষ করেন তিনিই—৬ উইকেটে পূর্ণ হয় ক্যারিয়ারসেরা স্পেল।
হাসানের টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তৃতীয় ফাইফার। তিনটিই এসেছে প্রতিপক্ষের মাটিতে। এর আগে ২০২৪ সালে চেন্নাইয়ে ভারতের বিপক্ষে এবং একই বছর রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটেও পাঁচ উইকেট নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে প্রতিপক্ষের মাটিতে টেস্টে তিনবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও এখন হাসানের। ১৫ ম্যাচেই তিনটি ফাইফার নিয়ে তিনি উঠে এসেছেন দেশের পেসারদের সেরাদের কাতারে। তাঁর ওপরে আছেন শাহাদাত হোসেন, ৩৮ ম্যাচে যার পাঁচ উইকেট নেওয়ার সংখ্যা চারটি।
তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটির এই কীর্তি হাসানের কাছে নিঃসন্দেহে আলাদা। ইনিংস বিরতিতে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গে আলাপচারিতায়ও তিনি কৃতিত্বটা একা নিতে চাননি। নিজের লাইন-লেন্থ ধরে রাখা, প্রক্রিয়া মেনে চলা এবং অধিনায়কের নির্দেশ অনুসরণ করাকেই সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।



