দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই যেন গল্পটা নিজেদের মতো করে লিখছে বাংলাদেশ। প্রথম দিনে হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় দিনটি হয়ে উঠল তানজিদ হাসান তামিমের। মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড, প্যাট কামিন্সদের সামলে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে শুধু দলকে এগিয়ে দেননি, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে শতক করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবেও ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন এই বাঁহাতি ওপেনার।
দিনের শুরুতে তানজিদের সংগ্রহ ছিল ৩২ রান। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ইনিংসটিকে বড় করেছেন তিনি। নতুন বলের কঠিন সময় পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে দেখিয়েছেন দৃঢ়তা ও ধৈর্য। শেষ পর্যন্ত ১৯৭ বলে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় ১০১ রান করে থামেন তিনি। তার সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে এনে দেয় বড় লিডের ভিত্তি।
দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৬ উইকেটে ৩৫১ রান। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেয়ে ১৫৩ রানে এগিয়ে থেকে তৃতীয় দিনে ব্যাটিংয়ে নামবে সফরকারীরা। ক্রিজে আছেন মেহেদী হাসান মিরাজ ৩২ ও হাসান মাহমুদ ১৩ রানে। ম্যাচের আরও তিন দিন বাকি থাকলেও দ্বিতীয় দিনের শেষে পাল্লাটা স্পষ্টতই বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে।
তবে এই দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত ছিল তানজিদের শতক। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই এমন কীর্তি গড়ার পরও নিজের সাফল্যের চেয়ে বাবা-মায়ের কথাই আগে মনে পড়েছে তার। দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তানজিদ বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো একটা দিন পার করেছি আমরা। দ্বিতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি পাওয়াটা আমার জন্য সত্যি অনেক ভালো লাগার একটি মুহূর্ত। সেঞ্চুরিটা যেহেতু অবশ্যই স্পেশাল, আমি আমার বাবা-মায়ের জন্য এটা উৎসর্গ করতে চাই।’
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার খেলতে নেমে দ্বিতীয় টেস্টেই এমন ইনিংস-তানজিদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই এটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে খেলার সুযোগ পাওয়া দারুণ ব্যাপার। আমার জন্য এটি খুবই বিশেষ কারণ আমি এখানে প্রথমবার এসেছি এবং এটি আমার মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। এই শতকটা আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করতে চাই।’
সেঞ্চুরির পথে অস্ট্রেলিয়ার তারকা পেসারদের বিপক্ষে তানজিদের ব্যাটিং ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। স্টার্ক, হ্যাজলউড কিংবা কামিন্স-কার বল তুলনামূলক সহজ ছিল, আর কার বল কঠিন, এমন প্রশ্নে কোনো নির্দিষ্ট বোলারের নাম না নিয়ে নিজের ব্যাটিং দর্শনই তুলে ধরেছেন তিনি, ‘আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে ওদের বিপক্ষে নতুন বলে খেলাটা একটু কঠিন ছিল। আর আমি আসলে কখনো বোলার দেখে খেলি না, আমি সবসময় চেষ্টা করেছি বলের মেরিট অনুযায়ী ব্যাটিং করার।’
এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে তানজিদের ইনিংসের মূল শক্তি। প্রতিপক্ষের নাম কিংবা বোলারের খ্যাতি নয়, বলের মান বুঝেই খেলেছেন তিনি। আর সেই পদ্ধতিই শেষ পর্যন্ত এনে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক শতক।
শতক পূর্ণ করার পর আউট হয়ে মাঠ ছাড়ার সময় অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের কাছ থেকে স্ট্যান্ডিং ওভেশনও পেয়েছেন তানজিদ। এমন অভিজ্ঞতা তার কাছে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যেরই অংশ। সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন পাওয়াটা আসলে অনেক ভালো লাগার একটি জায়গা। খুব ভালো লাগছিল, এটাই হয়তো টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য যা আজকে অনুভব করেছি।’
সাদা বলের ক্রিকেটে শতক আগেই ছিল তানজিদের। চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে তিন অঙ্ক ছুঁয়েছিলেন তিনি। এবার লাল বলের ক্রিকেটেও সেই স্বাদ পেলেন। তবে এই শতকের গুরুত্ব অন্যরকম-কারণ এটি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, বিশ্বের অন্যতম কঠিন পেস আক্রমণের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় খুলে দিয়ে।
দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের সামনে এখন একটাই লক্ষ্য-লিডকে যতটা সম্ভব বড় করা। তানজিদও মনে করেন, যত বেশি সময় ব্যাটিং করা যাবে, ততই ম্যাচ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তার ভাষায়, ‘আমাদের মনে হয় যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বেশি ব্যাটিং করতে পারব ততক্ষণ আমাদের দলের জন্য ভালো। যেহেতু আমাদের হাতে এখনো তিন দিন সময় আছে, আমরা চাইব যত বেশি সেশন ব্যাটিং করা যায়। যত বেশি রান দেওয়া যাবে আমাদের বোলারদের জন্য কাজটা তত সহজ হবে।’



