বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণ এখন আর কেবল উপমহাদেশের উইকেটেই সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। নাহিদ রানার দুরন্ত গতি, তাসকিন আহমেদের ধারাবাহিকতা, শরিফুল ইসলামের সুইং ও হাসান মাহমুদের কার্যকারিতা মিলিয়ে নতুন এক পেস ইউনিট গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ। আগামী আগস্টে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজকে সামনে রেখে এই বোলিং আক্রমণ নিয়ে বেশ সতর্ক অস্ট্রেলিয়া। তবে নিজেদের বিশ্বমানের পেস আক্রমণকেই এখনও এগিয়ে রাখছেন প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের পেসারদের পারফরম্যান্সে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দেশের মাটিতে স্পোর্টিং উইকেট তৈরির উদ্যোগও সেই উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে নাহিদ রানা নিজের গতি ও বাউন্স দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার আগুনঝরা বোলিং বাংলাদেশের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামও ধারাবাহিকভাবে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করে যাচ্ছেন।
পরিসংখ্যানও বাংলাদেশের পেস আক্রমণের উন্নতির পক্ষে কথা বলছে। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে টেস্ট ক্রিকেটে ১৪০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে বল করা পেস আক্রমণের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই সময়ে বাংলাদেশের পেসারদের ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ ডেলিভারি ছিল ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির। এই তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কেবল অস্ট্রেলিয়া, যাদের পেসাররা ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ ডেলিভারি করেছেন ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে।
আগামী সিরিজে দুই দলের পেসারদের মধ্যে গতি ও দক্ষতার লড়াই দেখার অপেক্ষায় ক্রিকেটপ্রেমীরা। বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের প্রশংসা করে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘এখন আপনি যদি টেস্ট ক্রিকেটের দিকে তাকান তাহলে ওদের তাসকিন, (নাহিদ) রানা এবং শরিফুল আছে। এমনকি এদের বাইরেও ওদের যথেষ্ট ব্যাকআপ আছে। যারা কিনা খুব ভালো বোলার। ওদের এমন একটা পেস বোলিং আক্রমণ আছে যারা কিনা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বেশ কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।’
বাংলাদেশের বোলারদের কাছ থেকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, সে বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে চায় অস্ট্রেলিয়া। ম্যাকডোনাল্ডের মতে, সম্প্রতি হওয়া টি-টোয়েন্টি সিরিজ তাদের সেই প্রস্তুতিতে সহায়ক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের প্রস্তুতিটা খুব ভালোভাবে সারতে হবে। আমি জানি এটা ভিন্ন একটা ফরম্যাট। তবে ওদের বোলাররা কেমন করছে সেটা পরখ করে দেখে নেওয়ার জন্য টি-টোয়েন্টি সিরিজটা আমাদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ ছিল।’
তবে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের প্রশংসা করলেও নিজের দলের পেস শক্তির ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে অস্ট্রেলিয়া কোচের। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড, মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোল্যান্ডকে নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণকে এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা বলেই মনে করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী ব্যাটারদের সংগ্রামের উদাহরণও টেনে এনেছেন ম্যাকডোনাল্ড। সর্বশেষ অ্যাশেজে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এর আগে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতেও ভারতের বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা ও শুভমান গিলদের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারদের রান তুলতে ভুগতে হয়েছে। এসব উদাহরণ দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে রান করা সব সময়ই কঠিন।
ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘যেকোনো সফরকারী দলের জন্যই রান তোলা সবসময় একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা অস্ট্রেলিয়াতেও দেখেছি যে এখানকার উইকেটের কারণে আমাদের নিজেদের দলের ব্যাটসম্যানরাও রান পেতে বেশ ভুগেছে।’
সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণে ব্যাটারদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পেস আক্রমণকে সম্মান জানিয়ে নিজের দলের বোলিং ইউনিটকেই এগিয়ে রাখেন তিনি, ‘আমাদের পেস বোলিং আক্রমণ কিন্তু বেশ কার্যকর। তাই আপনি যদি এমনটা ভাবেন যে তাদের (বাংলাদেশ) বোলিং আক্রমণ ভালো তাহলে বলব আমাদেরটা তাদের চেয়েও কিছুটা বেশিই ভালো। তবে সিরিজের জয়-পরাজয়টা শেষ পর্যন্ত ব্যাটারদের রান তোলার উপর নির্ভর করবে।’
আগস্টের টেস্ট সিরিজ তাই শুধু দুই দলের লড়াই নয়, বিশ্বের অন্যতম দুই গতিময় পেস আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ারও মঞ্চ হতে যাচ্ছে। একদিকে নাহিদ-তাসকিন-শরিফুলদের উত্থান, অন্যদিকে কামিন্স-স্টার্ক-হ্যাজেলউডদের অভিজ্ঞতা-এই দ্বৈরথই হতে পারে সিরিজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।









Discussion about this post