দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত ৪ উইকেটের হার। সেই হারেই শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের নারী দলের বিশ্বকাপ অভিযান। সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও এবারের বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতে ফিরছে না টাইগ্রেসরা। বরং নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক আসরে দুটি জয়, শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই এবং বিদেশের কন্ডিশনে মূল্যবান অভিজ্ঞতা-সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্য হয়ে থাকছে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর আনুষ্ঠানিকভাবে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় বাংলাদেশ। অন্যদিকে প্রোটিয়ারা নিশ্চিত করেছে সেমিফাইনাল। শেষ চারে তাদের সঙ্গী হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ফলাফল হতাশার হলেও পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল আগের যেকোনো বিশ্বকাপের চেয়ে উজ্জ্বল। নেদারল্যান্ডসের পর পাকিস্তানকে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি বিশ্বকাপ আসরে দুটি জয় তুলে নেয় টাইগ্রেসরা। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছে দলটি।
বিশ্বকাপ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির কণ্ঠে ছিল না হতাশার সুর। বরং দলের লড়াই, শেখা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদই ফুটে উঠেছে তার কথায়।
জ্যোতি বলেছেন, ‘(লর্ডসে খেলা) অবশ্যই দারুণ অনুভূতি। এটি একটি ঐতিহাসিক ও আইকনিক মাঠ, সবাই এ সম্পর্কে জানে। আমরা চেয়েছিলাম এখানে এমন কিছু করতে, যা আমাদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মেয়েরা যেভাবে খেলেছে, সেটা অসাধারণ। বিশেষ করে পাওয়ারপ্লেতে আমরা দ্রুত উইকেট হারানোর পরও সোবহানার (মোস্তারী) ব্যাটিং খুব ভালো ছিল। আর টুর্নামেন্টজুড়েই আমাদের বোলাররা দারুণ করেছে।’
অধিনায়কের মতে, ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতাই দলের জন্য বড় অর্জন। তবে তার বিশ্বাস, বাংলাদেশ আরও ভালো ফল করার সামর্থ্য রাখে।
জ্যোতি বলেন, ‘প্রথমত, আমরা আগে কখনও ইংল্যান্ডে খেলিনি। পুরো দলের জন্য এটি ছিল দারুণ একটি অভিজ্ঞতা। আমার মনে হয়, আমরা আরও ভালো করতে পারতাম, কারণ আমাদের সামর্থ্য এর চেয়ে বেশি। কিন্তু কয়েকটি ম্যাচে ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আমরা যথেষ্ট রান করতে পারিনি। তবে আমাদের বোলাররা ধারাবাহিকভাবে খুব ভালো পারফর্ম করেছে।’
বাংলাদেশের ক্রিকেট এখনও বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর তুলনায় পিছিয়ে-এ কথাও স্বীকার করেছেন অধিনায়ক। তবে সেই ব্যবধান কমানোর পথও দেখছেন তিনি।
জ্যোতি বলেন, ‘শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে আমাদের পার্থক্য অবশ্যই আছে। কারণ আমরা এমন কন্ডিশনে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাই না। এটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে খেলোয়াড়রা খুব ভালোভাবে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে এবং দলের জন্য লড়াই করেছে। কয়েকজন ব্যক্তিগতভাবেও দারুণ পারফর্ম করেছে। তাই এই টুর্নামেন্ট থেকে অনেক শিক্ষা এবং অনেক ইতিবাচক দিক আমরা নিয়ে যাচ্ছি।’
নারী ক্রিকেটে প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে বলেও মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। বিশেষ করে স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মতো দলগুলোর উন্নতি বিশ্ব ক্রিকেটকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
এ প্রসঙ্গে জ্যোতির ভাষ্য, ‘ওরা গত কয়েক বছর ধরে খুব ভালো খেলছে। তারা নিয়মিত শীর্ষ দলগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আমরা যখন তাদের বিপক্ষে খেলেছি, তখনও দেখেছি তারা অনেক উন্নতি করেছে। এখন প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। আগে শীর্ষ দলগুলো আমাদের কিছুটা হালকাভাবে নিত, কিন্তু এখন আর তা করে না। কারণ এখন প্রতিটি দল জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামে, আর এই টুর্নামেন্টেও সেটাই দেখা গেছে।’
ইংল্যান্ডের উইকেট ও কন্ডিশন নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার মতে, এই ধরনের পরিবেশে নিয়মিত খেলতে পারলে বাংলাদেশের ব্যাটারদের দক্ষতা আরও বাড়বে।
জ্যোতি বলেন, ‘অবশ্যই এটি চ্যালেঞ্জিং, কারণ আমরা এমন কন্ডিশনে অভ্যস্ত নই। তবে ইংল্যান্ডে আমরা বেশ কয়েকটি ম্যাচ খেলেছি, বিভিন্ন মাঠেও খেলেছি। আমরা দেখেছি এখানে ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো উইকেট ছিল। আমার মনে হয়, এই কন্ডিশনে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। কারণ আমরা সাধারণত উপমহাদেশের স্পিন-সহায়ক উইকেটে খেলি, যেখানে ব্যাটাররা স্ট্রাইক রেট নিয়ে সমস্যায় পড়ে। কিন্তু এমন কন্ডিশনে ব্যাটাররা বেশি রান করতে পারে, এতে তাদের স্কিলেরও উন্নতি হয়।’
সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়া হয়নি, তবে এবারের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। প্রথমবার এক আসরে দুটি জয়, কঠিন কন্ডিশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করার মানসিকতা-ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তাই রেখে গেল নিগার সুলতানা জ্যোতির দল।










Discussion about this post