বাংলাদেশ ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিম এখন শুধু একজন সিনিয়র ক্রিকেটার নন, তিনি এক যুগের প্রতীক। বয়স ৪০ ছুঁয়েছে, তবু ফিটনেস, নিবেদন আর পারফরম্যান্সে এখনো জাতীয় দলের অন্যতম ভরসা তিনি। তবে সময়ের বাস্তবতা মেনেই ভবিষ্যতের কথাও ভাবছেন এই অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর বিদায়ের পর দলের দায়িত্ব কে নেবেন, সেটি নিয়েই এখন ভাবনা মুশফিকের।
ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসরের পর বাংলাদেশ দল যে শূন্যতার মুখে পড়েছে, সেটি নতুন করে বুঝতে পেরেছেন মুশফিক নিজেও। এমনকি তাঁকে আবার জাতীয় দলে ফেরার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বরং ভবিষ্যতের জন্য নতুন মুখ তৈরি করতেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। তাঁর চোখে সম্ভাবনাময় নাম তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অমিত হাসান। পাকিস্তান সিরিজে প্রথমবার টেস্ট দলে ডাক পাওয়া এই ক্রিকেটারকে নিয়েই আশাবাদী বাংলাদেশের অন্যতম সফল ব্যাটার।
মুশফিক বলেন, ‘এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। চেষ্টা করব আমি ছাড়ার আগে আরও ২-৩টা প্লেয়ার ঐ জায়গায় থাকে। ওয়ানডে দল যেমন গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাপ তখনই হয় যখন ‘এ’ দল বা এইচপির ট্যুর বা খেলা হয় না। এখন যারা ঐ জায়গায় আছে তারা যেন যথেষ্ট কোয়ালিটি ম্যাচ খেলে। পরের ১৫-২০ বছর যেন ওরকম সার্ভিস দিতে পারে। নাম বলা কঠিন। তবে অমিতকে নিয়ে আমি আশাবাদী। ও যে টাইপ ক্যারেক্টার, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। কাজ করে যেতে হবে।’
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মুশফিক এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের একজন। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি অন্যতম প্রবীণ ক্রিকেটার। এই দীর্ঘ পথচলায় পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলো এখন তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াকেই নিজের বড় দায়িত্ব মনে করছেন তিনি।
মুশফিক বলেন, ‘আমি আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার চেষ্টা করি। একটু হলেও ধারণা আছে। শুধু টেস্টেই না, মুমিনুল বলেন বা তরুণ অমিত, আমরা ২৫-৩০ বছর ধরে সবাইকে চিনি। কোথাও না কোথাও একসাথে খেলেছি। আমাদের সবার বোঝাপড়া অনেক ভালো। ওদের যেটা লাগে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমিও আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে দলে কন্ট্রিবিউটের চেষ্টা করি।’
৪০ বছর বয়সেও অনুশীলনে বাড়তি সময় দেওয়া মুশফিকের নিয়মিত অভ্যাস। জাতীয় দলের অনুশীলন শেষ হওয়ার পরও প্রায়ই আলাদা করে কাজ করতে দেখা যায় তাকে। নিজের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতি যার যার বিষয়। আমার জন্য যেটা আত্মবিশ্বাস দেয় সেই হিসেবে প্রক্রিয়া ঠিক রাখার চেষ্টা করছি। টিমের ট্রেনিংয়ে ১৫ জন থাকে, একসাথে সবাইকে সময় দেওয়া যায় না। এজন্য বাড়তি সময় বের করে নিই। আমি চাই না আমার জন্য এক-দেড় ঘণ্টা কেউ অপেক্ষা না করুক।’
শুধু নিজের পারফরম্যান্স নয়, পুরো দলের সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়েও ভাবছেন মুশফিক। বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর পেশাদার মানসিকতা গড়ে তোলাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর মতে, প্রতিভা থাকলেই হবে না, সেই প্রতিভাকে টিকিয়ে রাখতে দরকার কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মের মধ্যে থাকা।
এই প্রসঙ্গে মুশফিক বলেন, ‘খেলাটা এমন জিনিস, যেটা আপনার রুটি রুজি, এটার সাথে আপনি প্রতারণা করতে পারবেন না। আর এটা এমন না একদিন মন ভালো লাগলো সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করলেন, আরেকদিন মন ভালো লাগলো না সারাদিন ঘুমালেন। এটা এমন না। আপনাদেরও একটা ইথিক্স, নিয়মকানুন আছে। যারা অ্যাথলেট, তাদেরও রুলস-রেগুলেশন-ডিসিপ্লিন আছে। যেখানে শ্রম-মেধা ইনভেস্ট করলে আপনার রিটার্ন আসবে আর সেখানে কেউ যদি তা না করে, তার চেয়ে বড় বোকা কেউ নাই।’
আধুনিক ক্রিকেটের পরিবর্তিত বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেছেন মুশফিক। তাঁর মতে, এখনকার ক্রিকেটারদের কাজের চাপ আগের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ফিটনেস, ডায়েট ও জীবনযাপনের শৃঙ্খলাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মুশফিক বলেন, ‘আমরা বছরে বড়জোর ৪ মাস, ঘরোয়া মিলে ৫ মাস খেলতাম। এখন ১১ মাস ব্যস্ত থাকতে হয়। একজন অ্যাথলেটের জন্য নিজের ফিটনেস যে কত গুরুত্বপূর্ণ তারা বুঝতে পারছে। আমি যাওয়ার আগে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে দিতে চাই যাতে এখান থেকে পরের প্রজন্ম আরও উপরে নিয়ে যেতে পারে।’









Discussion about this post