তিন বলে যখন প্রয়োজন মাত্র তিন রান, তখন টিভি পর্দায় ভেসে ওঠে তাওহিদ হৃদয়ের মুখ। ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে মুখে হাত বুলাচ্ছিলেন তিনি, চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল টানটান উত্তেজনার ছাপ। দল তখন জয়ের একেবারে দোরগোড়ায়, অথচ তিনি তখন ক্রিজে নেই।
শেষ ওভারে খানিকটা নাটকীয়তা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো অঘটন হয়নি। রংপুর রাইডার্স ঠিকই পৌঁছে যায় লক্ষ্যে, আর হৃদয়ের মুখেও ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। শেষ মুহূর্তে মাঠে থাকতে না পারলেও ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরির নায়ক যে তিনিই।
বিপিএলের প্রাথমিক পর্বের শেষ দিনে মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে ৮ উইকেটে হারিয়েছে রংপুর রাইডার্স। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে নোয়াখালী ২০ ওভারে তোলে ২ উইকেটে ১৭৩ রান। জবাবে রংপুর ১৯.৪ ওভারেই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে, হাতে থাকে ৮ উইকেট।
নোয়াখালীর ইনিংসের শুরুটা ছিল বেশ ধীরগতির। প্রথম দুই ওভারে আসে মাত্র তিন রান। তৃতীয় ওভারে নাহিদ রানাকে চার ও ছক্কা হাঁকিয়ে ইনিংসে গতি আনার ইঙ্গিত দেন হাসান ইসাখিল। পঞ্চম ওভারে ফাহিম আশরাফকে ছক্কা মারলেও পাওয়ার প্লে শেষে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ৩৩ রান। সে সময় ২৫ বল খেলে ইসাখিলের রান ছিল ২০।
এর মধ্যেই আউট হয়ে যান মৌসুমে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা রহমতউল্লাহ আলি। অল্প সময় পর আলিস আল ইসলামের দৃষ্টিনন্দন ডেলিভারিতে বোল্ড হন জাকের আলি। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া এই কিপার-ব্যাটসম্যানের বিপিএল শেষ হয় হতাশার পরিসংখ্যান নিয়ে।
পাওয়ার প্লের পর আরও কমে যায় রানের গতি। পরের তিন ওভারে কোনো বাউন্ডারি আসেনি, ১০ ওভারে নোয়াখালীর রান ছিল মাত্র ৪৭। একপর্যায়ে ৩৫ বলে ২৩ রানে আটকে ছিলেন ইসাখিল। তবে ধীরে ধীরে হাত খুলে খেলতে শুরু করেন তিনি। ৫০ বলে ফিফটি স্পর্শ করার পর পাশে দাঁড়ানো হায়দার আলিও ছন্দ খুঁজে পান।
১৭ ওভার পর্যন্ত ইসাখিলের সেঞ্চুরি খুব একটা নিশ্চিত মনে হচ্ছিল না, তখন তাঁর রান ছিল ৬৭। তবে পরের দুই ওভারে দুটি ছক্কা ও একটি চারে তিনি এগিয়ে যান শতরানের পথে। শেষ ওভার শুরু করেন ৮৭ রান নিয়ে। আকিফ জাভেদের প্রথম বলটি নো হলেও সেটিকে পয়েন্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন তিনি। পরের বলের ফ্রি হিটে বল পাঠান গ্যালারিতে। ৭০ বলে দুই রান নিয়ে পূর্ণ করেন শতক, পরের বলেই মারেন আরেকটি ছক্কা। শেষ বলে হায়দারের বাউন্ডারিতে শেষ হয় নোয়াখালীর ইনিংস।
ইসাখিল ও হায়দারের অপরাজিত জুটিতে আসে ৭৪ বলে ১৩৭ রান, যা এবারের বিপিএলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। শেষ ছয় ওভারে নোয়াখালী তোলে ৯১ রান। ইসাখিল অপরাজিত থাকেন ১০৭ রানে, হায়দার করেন ৪২।
১৭৪ রানের লক্ষ্য তাড়ায় শুরু থেকেই রংপুরকে এগিয়ে নেন তাওহিদ হৃদয়। প্রথম চার ওভারেই তাঁর ব্যাট থেকে আসে পাঁচটি চার ও একটি ছক্কা। পাওয়ার প্লেতে রংপুর তোলে ৫৫ রান, যার মধ্যে হৃদয়ের অবদান ২৬ বলে ৪৭। অপর প্রান্তে দাভিদ মালান ছিলেন বেশ নীরব, পরে আর ছন্দেও ফিরতে পারেননি।
মালান আউট হলে ভাঙে ৭৮ রানের উদ্বোধনী জুটি। হৃদয় তখন করেন ৬১ রান। দ্বিতীয় উইকেটে লিটন দাসের সঙ্গে গড়ে তোলেন আরও ৮৭ রানের জুটি। ২৭ বলে ফিফটি পূর্ণ করা হৃদয় ৫৭ বলেই স্পর্শ করেন সেঞ্চুরি। বিপিএলে এটি তাঁর দ্বিতীয় শতক এবং এবারের আসরে সব মিলিয়ে তৃতীয়।
জয় থেকে মাত্র ৯ রান দূরে থাকতে আউট হন হৃদয়। তখন কিছুটা চাপ তৈরি হলেও লিটন দাস ও খুশদিল শাহ ঠান্ডা মাথায় বাকি কাজটা সেরে ফেলেন। দুই বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করে রংপুর।
এই জয়ে এবারের লিগ পর্বে রংপুর রাইডার্সের জয়সংখ্যা দাঁড়াল ছয়ে। অন্যদিকে ১০ ম্যাচে অষ্টম হার নিয়ে বিপিএল অভিযান শেষ করল প্রথমবার অংশ নেওয়া নোয়াখালী এক্সপ্রেস। রংপুর আগেই নিশ্চিত করেছে প্লে-অফ, এখন তাদের অপেক্ষা প্রথম কোয়ালিফায়ারের প্রতিপক্ষ নির্ধারণের। ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন ম্যাচজয়ী সেঞ্চুরিয়ান তাওহিদ হৃদয়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর-
নোয়াখালী এক্সপ্রেস: ২০ ওভারে ১৭৩/২ (ইসাখিল ১০৭*, রহমতউল্লাহ ৯, জাকের ৩, হায়দার ৪২*; ফাহিম ৪-০-৩৩-০, আকিফ ৪-০-৫৩-০, নাহিদ ৪-০-৪০-১, আলিস ৪-০-২২-১, খুশদিল ৪-০-২২-০)।
রংপুর রাইডার্স: ১৯.৪ ওভারে ১৭৪/২ (মালান ১৫, হৃদয় ১০৯, লিটন ৩৯*, খুশদিল ৩*; হাসান ৪-০-২৩-১, মুশফিক ৪-০-৪৭-০, মেহেদি রানা ৩.৪-০-৩১-০, সাব্বির ২-০-১৫-০, জাহির ৪-০-২৭-১, রহমত ১-০-১২-০, সৌম্য ১-০-১৮-০)।
ফল: রংপুর রাইডার্স ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা: তাওহিদ হৃদয়।










Discussion about this post