ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে যে কূটনৈতিক ও ক্রীড়া-সংক্রান্ত অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন ভারতের কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। তিনি এই সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে শশী থারুর লেখেন, “এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি।” পরে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোটেও তুলনাযোগ্য নয়। তাছাড়া, এই দুই দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা বা কূটনৈতিক সম্পর্কের যে পর্যায়, তা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের পর্যায় থেকে আলাদা। এই দুই দেশকে এক সরল সমীকরণে ফেলা যায় না।’
২০২৬ আইপিএলের নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয়, যা আইপিএলে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। তবে নিলামের পর থেকেই মুস্তাফিজের খেলা নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়।
গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পর বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এনে ভারতের কিছু রাজনৈতিক দল ও উগ্র ধর্মীয় সংগঠন মুস্তাফিজের আইপিএলে অংশগ্রহণের বিরোধিতা শুরু করে।
এই চাপ ও হুমকির প্রেক্ষাপটে শনিবার ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া কলকাতা নাইট রাইডার্সকে মুস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানান। এর পরপরই কেকেআর আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাঁহাতি পেসারকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই সিদ্ধান্তের রেশ ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও। ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যৌথভাবে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের কথা রয়েছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর সূচি ছিল। গ্রুপ পর্বের আরও দুটি ম্যাচও হওয়ার কথা ছিল একই ভেন্যুতে, আর শেষ ম্যাচ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে।
তবে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে ভারতে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বাংলাদেশ। বিসিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ জানিয়ে আইসিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রোববার বিসিবির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় দল টুর্নামেন্ট খেলতে ভারতে যাবে না।’ খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে ‘ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের’ কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের সরকারের পরামর্শেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি শিকার করে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
তিনি বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করার কথাও জানান এবং বলেন, ‘আমরা কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটার ও বাংলাদেশকে অবমাননা মেনে নিব না। গোলামির দিন শেষ!’
এক্সে দেওয়া আরেক পোস্টে আসিফ নজরুল লেখেন, যেখানে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে পুরো বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারে না।
মুস্তাফিজ ইস্যুতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ বিষয়ে ‘চুপ করে বসে থাকার উপায় নেই’। সেই বক্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে শশী থারুর এক্সে আরেকটি পোস্টে লেখেন, “শি ইজ রাইট, অ্যালাস।”










Discussion about this post