টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে, অথচ বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন নেই কোনো বিশ্বকাপের উত্তাপ। বরং আছে অবসর, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ অপেক্ষা। লিটন দাসদের অখণ্ড অবসর এই সময়টাকেই আরও প্রতীকী করে তুলেছে। যে সময়ে জাতীয় দলের মনোযোগ থাকার কথা বিশ্বমঞ্চে, সেই সময়েই প্রশ্ন উঠছে-বাংলাদেশের জন্য কি এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কার্যত শেষ হয়ে গেছে?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক পরিচালকের কথায় সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি মিলেছে। ‘আমাদের বিশ্বকাপ শেষ, কে কী করল-না করল, তাতে আমাদের কী’-এই মন্তব্যের পর তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন, ‘জাস্ট ওয়েট’। আইসিসি যখন বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বিকল্প দল ঘোষণা করেছে এবং নতুন সূচি প্রকাশ করেছে, তখন এই অপেক্ষা নিছক আশার কথা নয়। বরং এর পেছনে যে অন্য কোনো সমীকরণ কাজ করছে, সেটাই আলোচনার কেন্দ্রে।
এই সমীকরণের কেন্দ্রে পাকিস্তান। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু না বললেও, পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির বক্তব্য পুরো চিত্রটাকে নতুনভাবে দেখাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘এক দেশ আরেক দেশকে নির্দেশ দিতে পারে না। যদি এমন নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে পাকিস্তান অবশ্যই নিজের অবস্থান নেবে।’
এই বক্তব্যের পর থেকেই বিশ্বকাপ নাটকে পাকিস্তান হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। গতকাল লাহোরে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণার পর পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন নাকভি। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে, ক্রিকেটাররা তাঁকে বলেছেন, ‘আপনি ও সরকার যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’ এই বার্তা পরিষ্কার-সম্ভাব্য সিদ্ধান্তটা ক্রিকেটীয় হলেও তার মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে কি পাকিস্তান বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াবে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সুইজারল্যান্ড সফর শেষে আজ দেশে ফেরার কথা। তাঁর দেশে ফেরার পরই পিসিবি বিশ্বকাপ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্রিকেটারদের আগাম সমর্থন নিশ্চিত করার অর্থ, কঠিন সিদ্ধান্তের সামাজিক ও মানসিক চাপের জন্য দলকে প্রস্তুত রাখা।
বিশ্বকাপ বর্জনের গুঞ্জনের মধ্যেই সালমান আলী আগাকে অধিনায়ক করে ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে পিসিবি। একদিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে সম্ভাব্য বর্জনের আলোচনা-এই দ্বন্দ্বই বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ এই অনিশ্চয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘পাকিস্তান যদি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যায়, তাহলে সবকিছুই ভেঙে পড়বে। এটা আর বিশ্বকাপ থাকবে না। বিশ্বকাপের মান ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্তত ৫০ শতাংশ দর্শক শুধু ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দেখতেই আগ্রহী। পাকিস্তান না থাকলে সেই আগ্রহ অনেকটাই হারিয়ে যাবে।’
দর্শকের আগ্রহ কমে যাওয়ার অর্থ আইসিসির জন্য সরাসরি আর্থিক ধাক্কা। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থও এতে বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করলেও তাই আইসিসি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। সাবেক অস্ট্রেলীয় পেসার জেসন গিলেস্পি এক্সে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘ভারতের বাইরে কেন বাংলাদেশ খেলতে পারবে না, এ ব্যাপারে আইসিসি কি কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছে?’ সমালোচনার চাপে পড়ে সেই পোস্ট পরে মুছে ফেলতে হয় তাকে।
বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় হতাশ বিশ্ব ক্রিকেটারদের সংগঠন ডব্লুসিএ-ও। সংগঠনটির সভাপতি টম মোফাট বলেন, ‘আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে বড় এক টুর্নামেন্টে একটা ক্রিকেটীয় জাতির অভাব বোধ করবে বাংলাদেশ। ক্রিকেটের জন্য, বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও ভক্ত-সমর্থকদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক মুহূর্ত।’









Discussion about this post