বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে দেশে ফেরানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে, তবে বাস্তবে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আগ থেকেই তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সেই আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাম্প্রতিক নানা ইস্যু নিয়ে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনের সময় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাকিব বলেন, ‘প্রথমত, আমি বিশ্বকাপের আগে (২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) গিয়েছি যুক্তরাষ্ট্রে। মাঝে ২-৩ দিনের জন্য গিয়েছিলাম। পরে মেজর লিগ ক্রিকেট খেলেছি (যুক্তরাষ্ট্রে), পরে কানাডায় গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি খেলেছি। লম্বা সময় দেশ থেকে দূরে ছিলাম, দেশের পুরো উল্টো জায়গায় বলা চলে। স্বাভাবিকভাবেই আমার কাছে সব খবর আসত পরে। খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এত খবরও জানতাম না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, একটা সময়ে গিয়ে তো ইন্টারনেট পুরা বন্ধই ছিল। আমিও খুব বেশি আপ টু ডেট ছিলাম না। হ্যাঁ, শুনেছি যে প্রতিবাদ হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, শুনেছি কারফিউ দিয়েছে। আসলে বাংলাদেশে তো অনেক সময় অনেক ধরনের আন্দোলন হয়েছে এবং যেহেতু গভীরভাবে অনুসরণ করিনি এটা, চিন্তাও করিনি যে কতটা গুরুতর। খেলার ভেতরই ছিলাম। হয়তো দেশে থাকলে ঘটনার গভীরতা বুঝতে পারতাম, তখন আমার জন্য একটা স্ট্যান্স নেয়া সহজ হতো।’
সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীরব থাকার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যেটা বুঝি, সবাই আশা করেছে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেব। স্ট্যাটাস দিলে অনেকে দেখত অবশ্যই, কিন্তু পরিস্থিতি কি বদলে যেত? সরকার থেকে আমাকে বলাও হয়েছিল স্ট্যাটাস দিতে এবং সরকারের পক্ষে দিতেও বলা হয়নি। সুন্দর সমাধানের পথ খোঁজা ধরনের স্ট্যাটাস আর কী, অনেক ক্রিকেটার যেমন দিয়েছিল, তেমনই কিছু। কিন্তু ওসবে কি খুব বড় পার্থক্য হতো? জানি না।’
জুলাই আন্দোলনে প্রাণহানি এবং সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যেটা সবসময় বলি, প্রতিটি জীবন মূল্যবান। একটা পরিবারে যখন একটা মানুষ মারা যায়, সেই পরিবারের কষ্ট অন্য কারও পক্ষে বোঝা মুশকিল। প্রতিটা মানুষের জীবনই মানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন হামে কত বাচ্চা মারা গেছে এই যুগে এসে, ভাবা যায়! প্রতিটা মানুষের প্রাণ ম্যাটার করে। ওই সময় আন্দোলনকারী যারা মারা গেছেন, পুলিশ সদস্য যারা মারা গেছেন, যে অবস্থায় যারা মারা গেছেন, সবার লাইফই ম্যাটার করে।’
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগও উঠে এসেছে আলোচনায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যোগ্য শিশুদের মাত্র ৫৯ শতাংশ টিকা পেয়েছে, এবং ইতোমধ্যে আড়াই শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একসময় প্রায় নির্মূল হওয়া এই রোগের পুনরুত্থান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাকিব আর দেশে ফেরেননি। বর্তমানে পরিবারসহ নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন তিনি। যদিও পাকিস্তান ও ভারত সফরে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন, এরপর আর জাতীয় দলের জার্সিতে দেখা যায়নি তাকে।
নিজের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হলেও দেশে না ফেরার কারণ হিসেবে বাস্তবতা তুলে ধরেছেন তিনি। সাকিব বলেন, “আমার যেসব মামলা, দেশে এসে কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, দুদকের মামলায় জামিন নিতে পারি। কিন্তু দুদকের এরকম মামলা তো দেশে হাজার হাজার মানুষের আছে এবং তারা দেশে খুব ভালোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ব্যবসা করছে, সবই করছে।”
সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের শঙ্কা নিয়েও তিনি খোলামেলা কথা বলেন। “এখন তো আর কোনো কিছু অস্বাভাবিক মনে হয় না! যদিও আমি আশাবাদী যে ওরকম করা হবে না। যতক্ষণ না আমার দোষ প্রমাণিত হচ্ছে, সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অনেক কিছুই আমি ভাবতাম এক রকম, হচ্ছে আরেক রকম! কিছুই তাই বলা যায় না।”
তবে দেশে ফেরার আশা এখনো প্রবল। “(দেশে ফেরার আশার) পুরোপুরিই আছে। আমি ফিরব, আশা করি তাড়াতাড়িই ফিরতে পারব।”
ফেরার শর্তও স্পষ্ট করেছেন তিনি। “আমি দেশে ফিরব, কোর্টে যাব, মামলা লড়ব। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার নিরাপত্তা তো দিতে হবে! এতটুক তো আশা করতেই পারি। আমি বলছি না যে, নিরাপত্তা মানে আমার জন্য রাস্তা বন্ধ করে দিতে হবে বা পুলিশের চারটা গাড়ি সামনে থাকবে। ওরকম তো চাচ্ছি না। তবে একটা স্বাভাবিক নিরাপত্তা তো আছে, আইনী প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়রানি করবে না। ব্যাস, এতটুকুই আশা করি। সাধারণ নাগরিক হিসেবেই তো এটুকু আশা করতে পারি। হয়রানি না করার নিশ্চয়তা যদি কালকে দেওয়া হয়, পরশুই দেশে যাব আমি।”
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সাকিব। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর প্রতিই তার আনুগত্য থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। “সেটাই তো হওয়ার কথা (আওয়ামী লীগে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ), তাই না? আমার এত দল পরিবর্তন করার শখ নেই, ইচ্ছা নেই এবং কোনো কালেও ছিল না। আমি এই জিনিস কখনও করিনি। ঠিক আছে? আমি যদি একটা ছোট দলেও কোনো দিন নাম লিখিয়েছি তো ওই দলের প্রতি সবসময় অনুগত ছিলাম। পল্টি দেওয়ার অভ্যাস নেই।”
দলটি বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে তা অব্যাহত থাকবে না বলেই বিশ্বাস করেন তিনি। “এখন নিষিদ্ধ, তাই বলে আজীবন নিষিদ্ধ থাকবে নাকি? আজীবন কি কেউ কাউকে নিষিদ্ধ করে রাখতে পারে! এটা তো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। দেশের একটা বড় অংশকে তো দাবিয়ে রাখতে পারবেন না। হ্যাঁ, জোর করে কিছুদিন সম্ভব আটকে রাখা বা যতদিন সম্ভব দমিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু এটাতে আসলে দেশের কোনো উন্নতি বা রাজনীতির ভালো আছে বলে আমার মনে হয় না।”
অতীতের রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। “এই ভুলটা যদি আমরা করে থাকি, ১০-১৫-২০ বছর আগের রাজনীতির সেই সময়ে দলের ভাবনা তো আমি জানি না, কিন্তু আমরা যদি এরকম ভুল করে থাকি, সেই ভুলেরও তো তাহলে এখন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে! পরে যদি আবার অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসে বা আমরা আসি এবং পুনরাবৃত্তি করি, তাহলে এই খেলা তো চলতেই থাকবে। কাউকে না কাউকে এগুলো শেষ করতে হবে।”










Discussion about this post