টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে পাকিস্তান। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দিয়ে আইসিসিকে নতুন করে চিন্তার মুখে ফেলেছে দেশটির সরকার। টুর্নামেন্টের ঠিক আগমুহূর্তে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেট বিশ্বকে শুধু বিভক্তই করেনি, বরং নীতিবোধ, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ক্রীড়াগত ন্যায়ের প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক তারকা ব্যাটার মোহাম্মদ ইউসুফ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় বলেই মনে করছেন। তার মতে, এটি সহজ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে ক্রিকেটকে সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক করতে হলে এমন কঠিন অবস্থান নেওয়াই জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় ইউসুফ স্পষ্ট করে বলেন, বাণিজ্যিক লাভের চেয়ে মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার না দিলে ক্রিকেটে সুবিধাবাদী প্রভাব কখনোই থামবে না। খেলাধুলায় শুধু গর্ব নয়, সমতা ও ন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়ানো দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় আইসিসির ভূমিকা এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন ইউসুফ। মুস্তাফিজুর রহমান আইপিএল থেকে বাদ পড়ার পর নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত থেকে বিশ্বকাপে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে আইসিসি। এই সিদ্ধান্তকে দ্বিচারিতা আখ্যা দিয়ে ইউসুফ বলেছিলেন, বাংলাদেশের ন্যায্য নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করা আইসিসির শাসনব্যবস্থা ও ধারাবাহিকতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং ক্রিকেটকে প্রভাব নয়, নীতির ভিত্তিতে পরিচালনা করা উচিত।
তবে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজ বিষয়টি দেখছেন ভিন্ন চোখে। তার মতে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে সমর্থকদের। তিনি মনে করেন, মাঠের বাইরের বিরোধের জবাবে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানো ভক্তদের জন্য কোনো সুখবর নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ায় হাফিজ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পাকিস্তানের এই ঘোষণায় ভারতের সাবেক ক্রিকেটারদের প্রতিক্রিয়াও তীব্র। সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার মদন লালের মতে, বাংলাদেশকে সমর্থন দিতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ও পিসিবি আসলে নিজেদের ক্রিকেটকেই বিপদের মুখে ফেলছে। তিনি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত বর্তমান সংকটের কোনো সমাধান আনবে না, বরং বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুই দেশকেই এর মূল্য দিতে হবে।
মদন লাল আরও বলেন, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ সর্বোচ্চ থাকলেও এমন পরিস্থিতিতে স্পনসররা ধীরে ধীরে অন্য দলগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারে। নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলোর দিকেই শেষ পর্যন্ত দর্শক ও বাণিজ্যিক আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কিংবদন্তি ভারতীয় ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কার। তার মতে, টুর্নামেন্টের ঠিক আগমুহূর্তে সরে দাঁড়ানো আইসিসির জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইসিসির হস্তক্ষেপ জরুরি এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো দল এমন উদাহরণ তৈরি করতে না পারে, সে জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
গাভাস্কার আরও বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও বিবেচনায় আনতে পারে আইসিসি, যদিও তার ফল কী হবে তা নিশ্চিত নয়। তবে এই সিদ্ধান্তে আইসিসি যে ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া ও সমর্থকদের চাপ বাড়লে পাকিস্তান তাদের অবস্থান বদলাতেও পারে।
ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে দশম টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হবে ৭ ফেব্রুয়ারি।










Discussion about this post