বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন যেন দুই দিক থেকে চাপে। একদিকে বিশ্বকাপ খেলবে কি না-সে সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা, অন্যদিকে ঘরোয়া বিপিএলে দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের কড়াকড়িতে ক্রিকেটারদের মানসিক অস্বস্তি। এই দুই বাস্তবতা মিলিয়ে মাঠের ক্রিকেট যেন ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে খেলোয়াড়দের জন্য।
বিপিএলের শুরুতেই সিলেটে ছড়িয়ে পড়ে অস্বস্তির গুঞ্জন। অভিযোগ ওঠে, বিসিবির দুর্নীতি দমন বিভাগ টুর্নামেন্টকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ক্রিকেটারদের হঠাৎ জিজ্ঞাসাবাদ, ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ, ড্রেসিংরুমে অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি, এসব নিয়ে ক্ষোভ জমতে থাকে দলগুলোর মধ্যে। সেই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত বিসিবির টেবিলেও পৌঁছায় বলে জানা যায়।
গত বিপিএলের নানা অভিযোগের পর বিসিবি এবার দুর্নীতি দমনে কোনো ছাড় দিতে চায়নি। আইসিসির একজন কর্মকর্তাকে যুক্ত করা হয়, দায়িত্বে ছিলেন বিসিবির ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের প্রধান সাবেক আইসিসি কর্মকর্তা অ্যালেক্স মার্শালসহ একাধিক কর্মকর্তা। কিন্তু ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন-দুর্নীতির সন্দেহ আর খেলোয়াড়ের সম্মান ও মানসিক নিরাপত্তার সীমারেখা কি ঠিকভাবে মানা হয়েছে?
ঢাকা ক্যাপিটালসের ব্যাটার সাইফ হাসান বিপিএলের শেষ দিকে এসে প্রকাশ্যে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। দলের শেষ ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘প্রথম দুই-তিন ম্যাচে যখন ক্লিক করিনি, ওদের (দুর্নীতি দমন কর্মকর্তারা) কাছে লেগেছে যে, আমার পারফরম্যান্সটা মিলছে হচ্ছে না গত বছরের সঙ্গে, মানে গত বছর যেভাবে খেলেছি। ওদের কাছে জিনিসটা স্বাভাবিক লাগেনি। ওরা এসে হুট করে চার্জ করছে। এটা আমার ভালো লাগেনি। ডিস্টার্বড হয়েছি।’
ক্রিকেট খেলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাইফের কণ্ঠে ছিল হতাশা, ‘কারণ আমি এটার জন্য ক্রিকেট খেলি না। আমি আমার প্যাশন নিয়ে ক্রিকেট খেলি। আমার পারিবারের ব্যাকগ্রাউন্ডও ওরকম না। এই জিনিসটা নিয়ে আমি অনেক বিরক্ত হয়েছি অবশ্যই। তবে ম্যানেজমেন্টকে ধন্যবাদ ওরা মানে সবসময় আমাকে সমর্থন দিয়ে গেছে।’
ড্রেসিংরুমে আচমকা উপস্থিতির অভিজ্ঞতাও জানান তিনি, ‘ব্যাটিংয়ে নামার আগে জিজ্ঞেস করেনি। তবে তখন আমাদের ড্রেসিংরুমে এসেছিল। ড্রেসিংরুমে এসে জিজ্ঞেস করছে, ব্যাটিংয়ে নামছো নাকি বা এরকম। ব্যাটিংয়ে নামার আগে ড্রেসিংরুমে ছিলাম। তখন এসেছিল, আর তার আগের দিন রুমে এসেছিল।’
এই আচরণকে অসম্মানজনক বলেই মনে হয়েছে সাইফের কাছে, ‘অবশ্যই বিস্ময়কর এই ব্যাপারটা। আমি বিশ্রাম নেব, তখন হুট করে এসেছে। (রাহমানউল্লাহ) গুরবাজ তো ঘুমাচ্ছিল, তখন এসেছে। আগে থেকে তো জানাবে! হুট করে আসা মানে, এটা তো অনেক অসম্মানজনক।’
গুরবাজের কক্ষে হঠাৎ ঢুকে পড়ার ঘটনাটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আফগান এই তারকা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে টুর্নামেন্ট ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সিলেট থেকে ঢাকায় ফিরেও যান। পরে বিসিবির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
ক্ষতিটা তখন হয়ে গেছে। সাইফ স্বীকার করেন, সেই অভিজ্ঞতা তার ব্যাটিংয়েও প্রভাব ফেলেছে, ‘একটু তো হতে পারে এটা, কারণ ওটার পরপর যে দুই-তিনটা ম্যাচ, মনের কোণে কাজ করতেই পারে যে, আমি কী করছি, না করছি, এটা কী হচ্ছে, তারা কী ভাবছে…। তবে একটা বিরতির পর চিন্তা করছি যে এগুলো তো আমার হাতে নেই। চেষ্টা করছি যে এখান থেকে বের হওয়ার।’
এই মানসিক অস্থিরতার সময়েই বাংলাদেশের ক্রিকেট আরেক বড় অনিশ্চয়তার মুখে-টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আইসিসি জানিয়েছে, আগামী ২১ জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। সূচি অনুযায়ী ভারতের ভেন্যুতে খেলতে আপত্তি জানিয়ে বিসিবি শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে সামনে রেখে বিসিবির নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে।
বোর্ডরুমে সিদ্ধান্তহীনতা থাকলেও মাঠের ক্রিকেটাররা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছেন। বিপিএলের শেষ ম্যাচে সেঞ্চুরি করা তাওহীদ হৃদয় স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিশ্বকাপের বিষয়টা তো আসলে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। যে জিনিসটা নিয়ন্ত্রণে নেই এটা নিয়ে চিন্তা করা মানে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সময়ের অপচয়। যখনই আমরা জানব (কোথায় খেলা), আমরা প্রস্তুত আছি। আমরা সবাই খেলার ভিতরে আছি এবং প্রস্তুতিও খুব ভালো ভাবে নিচ্ছি। আমরা সবাই খেলতে প্রস্তুত আছি।’










Discussion about this post