বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সর্বশেষ নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের জেরে প্রায় ছয় মাস ধরে ঢাকার শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটি বড় অংশ সব ধরনের ঘরোয়া লিগ বয়কট করে আসছে। সেই অভিযোগকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে রোববার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি) লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন কাউন্সিলর ও ক্লাব সংগঠকদের একটি বড় অংশ।
৫১টি ক্লাবের পক্ষে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও গুলশান ক্রিকেট ক্লাবের কাউন্সিলর তামিম ইকবাল, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন, মোহামেডান ক্লাবের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান, সাবেক বোর্ড পরিচালক ও সূর্যতরুণ ক্লাবের কাউন্সিলর ফাহিম সিনহা, ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্রের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম বাবু, বাংলাদেশ বয়েজের কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান তপু, প্রগতি সেবা সংঘের কাউন্সিলর সাব্বির আহমেদ রুবেল এবং গোপিবাগ ফ্রেন্ডসের কাউন্সিলর শফিউল ইসলাম শফুসহ অন্যরা এনএসসি সচিবের কাছে এই অভিযোগ ও তদন্তের আবেদন জমা দেন।
অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। সেখানে তামিম ইকবাল বলেন, ‘সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, ৭৬টি ক্লাবের মধ্যে ৫০টি ক্লাবই এই নির্বাচন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। আবাহনী ও মোহামেডানের মতো বড় ক্লাবগুলোও এই বিষয়ে একমত। ৫০টি ক্লাব যদি বলে প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার থাকে না। আবাহনী ও মোহামেডানের মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটি ক্লাবও আছে। তারাও এই বিষয়ে একমত। তাই ৫০টি ক্লাব যদি আপত্তি জানিয়ে থাকে, তাহলে এর বেশি আর নতুন করে কিছু বলার দরকার নেই।’
বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচনকে ঘিরে অসন্তোষের কারণে ঢাকার অনেক ক্লাবই বর্তমান বোর্ডকে শুরু থেকেই অবৈধ বলে দাবি করে আসছে। এমনকি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি তারা। চলতি বোর্ডের অধীনেও ঢাকার প্রায় ৪৫টি ক্লাব বিভিন্ন লিগে অংশ নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংগঠকরা।
এই পরিস্থিতিতে ঘরোয়া ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তামিম ইকবাল বলেন, ‘প্রিমিয়ার লিগ যদি খেলা না হয় তাহলে কী হবে? এসব কিন্তু প্রশ্ন করতে হবে, এগুলো জানতে হবে, ওদের উত্তর দিতে হবে।’
ঘরোয়া ক্রিকেটের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এসব আলোচনার মধ্যে খেলা যে হচ্ছে না এই জিনিসটা আমরা সবসময় ভুলে যাই। ক্রিকেট বোর্ডকে এই জিনিসটার উত্তর দিতে হবে যে খেলা কেন হচ্ছে না। হ্যাঁ, আপনি ১২ টা টিম নিয়ে খেলছেন, ৮ টা টিমে ১০০-১৫০ টা প্লেয়ার, প্রথম বিভাগে আলাদাভাবে টুর্নামেন্ট করা হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় বিভাগের করা হয়নি, তৃতীয় বিভাগেও হয়নি।’
ক্লাব সংগঠক মাসুদুজ্জামান বিসিবির নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বিসিবিতে এত খারাপ পরিস্থিতিতে নির্বাচন আর কখনো হয়নি। আমরা মাঠের মানুষ মাঠে ফিরতে চাই। ১৭-১৮ বছর পর দেশে এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাই আমরা ন্যায়বিচারের আশায় তদন্তের আবেদন করেছি। এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে এবং আমরা মনে করি এখনই কথা বলার সঠিক সময়। এই কারণেই আমরা আবেদন করেছি। আমরা আশা করি, সরকারের পাশাপাশি আদালতের কাছ থেকেও আমরা ন্যায়বিচার পাব।’
অন্যদিকে সাবেক বোর্ড পরিচালক ফাহিম সিনহা জানিয়েছেন, তারা একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের আবেদন করেছি। সেখানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের একজন প্রতিনিধি থাকতে পারেন। কমিটির গঠন কিভাবে হবে, সেটি সরকার ঠিক করবে। তদন্ত হলে সেখানে আমাদের সাক্ষ্য নেওয়া হবে। আমরা তখন বলতে পারব, সেই সময়ে আমরা কী কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। আপনারা জানেন, তখন আমি বোর্ডের সহ-সভাপতি ছিলাম। আমার চোখের সামনে বোর্ডের ভেতরে কীভাবে নানা ধরনের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, সেগুলো আমি তুলে ধরতে চাই। আদালতে ডাকলে অবশ্যই আমি এসব বিষয় বলব। বোর্ড মিটিংয়ের রেকর্ডেও অনেক ঘটনা রয়েছে। যদি কেউ সেগুলো অস্বীকার করে, আমরা সেগুলো চ্যালেঞ্জ করব। আমরা আশা করি ন্যায়বিচার পাব।’
ঘরোয়া ক্রিকেট বন্ধ থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন ফাহিম সিনহা। তিনি বলেন, ‘এই বিতর্কের ভিড়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি যে খেলা হচ্ছে না। কেন লিগগুলো হচ্ছে না, তার জবাব বোর্ডকে দিতে হবে। ১২টি দল নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ করানোর চেষ্টা হলেও নিচের সারির লিগগুলো বন্ধ। এই ক্লাবগুলো নির্বাচন নিয়ে একমত না হওয়ায় এখন সব টুর্নামেন্টই অনিশ্চয়তার মুখে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ায়ই এগোতে চাই এবং যথাযথ নিয়ম মেনেই বিষয়গুলো সামনে আনছি। আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে বলেই আমরা এই পথে এগোচ্ছি।’










Discussion about this post