ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইসিসির সিকিউরিটি ম্যানেজার ডেভিড মাসকারের পাঠানো একটি চিঠি। এই চিঠিতে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা বা ম্যাচ স্থানান্তরের সুপারিশ না থাকলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আলাদা করে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আইসিসির চিঠিতে প্রথমেই সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ২০২৬ মৌসুমের চুক্তি থেকে বাদ দেয়।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আইসিসিকে জানায়, অনির্দিষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তারা বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলছে। একই সঙ্গে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার আইপিএল সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে।
চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, মুস্তাফিজ ইস্যুর অনেক আগেই বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছিল। আইসিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সম্পন্ন হওয়া একটি স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ঝুঁকির মাত্রা ‘মাঝারি থেকে উচ্চ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে করা সংক্ষিপ্ত আরেকটি মূল্যায়নে ঝুঁকি কিছুটা কমে ‘মাঝারি’ পর্যায়ে থাকলেও সেটি পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
এই মূল্যায়নে বাংলাদেশের দলের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট হামলা বা হুমকির তথ্য পাওয়া যায়নি বলে চিঠিতে পরিষ্কার করা হয়েছে। তবে সতর্কতামূলক পর্যবেক্ষণ হিসেবে বলা হয়েছে, ধর্মীয় উগ্রবাদ সক্রিয় থাকলে মুস্তাফিজুর রহমানের উপস্থিতি বিতর্ক বা উত্তেজনার কারণ হতে পারে। ঝুঁকির বিষয়টি তাৎক্ষণিক নয়, বরং সম্ভাব্য সামাজিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আইসিসির চিঠিতে খেলোয়াড়দের বাইরের পরিসরেও নজর দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সমর্থক ও সাংবাদিকরা যারা বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভারত সফর করবেন, তাদের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের জার্সি পরে মাঠে খেলা দেখতে গেলে সমর্থকদের জন্য মাঝারি মাত্রার ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে আইসিসি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ দল বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংস ঘটনার সম্ভাবনা কম।
চিঠিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে, যা বিশ্বকাপ চলাকালীন সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে চিঠির শেষভাগে আইসিসি পরিষ্কার করে জানায়, এই ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে ভারতের আয়োজনকে অনিরাপদ বলা হচ্ছে না এবং বাংলাদেশের ভারত সফরকে পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। সে কারণে ম্যাচ বাতিল বা সূচি পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়নি। বরং সতর্কতা, বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখাকেই আইসিসির চিঠির মূল বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।









Discussion about this post