গম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর এই বিশেষ দিনে দেশের নারীদের অগ্রযাত্রায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার প্রতিবছর রোকেয়া পদক প্রদান করে থাকে। এ বছরের পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম জাতীয় নারী ফুটবল দলের উদীয়মান তারকা ঋতুপর্ণা চাকমা। পাহাড়ি রাঙামাটির এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের উজ্জ্বল মুখ হয়ে ওঠার পথচলায় তার অর্জন যেমন দৃষ্টান্তমূলক, তেমনি তার সংগ্রামের গল্পও অনুপ্রেরণার।
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঋতুপর্ণার হাতে পদক তুলে দিলে পুরো মিলনায়তনে যেন এক বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি পুরস্কারই সম্মান ও গৌরবের। এই বছরই একুশে পদক পেয়েছি। যা অত্যন্ত গৌরবের। সেটা ছিল দলীয়। এবার ব্যক্তিগতভাবে রোকেয়া পদক পেয়েছি, সরকারের এই পদকটি তাই আমার কাছে বিশেষ।’
তার এই বিশেষ অনুভূতির পেছনে রয়েছে বহু বছরের লড়াই। খুব ছোট বয়সে বাবাকে হারানো, তিন বছর আগে ছোট ভাই পার্বণ চাকমার আকস্মিক মৃত্যু, আর মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, এ সবকিছুই জীবনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। তবুও তিনি পিছিয়ে না গিয়ে লড়াই করে গেছেন। নিজের আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ বাবা বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। ভাইকেও মিস করছি। মা অনেক সংগ্রাম করেছেন। আমার এই সাফল্যের পেছনে পুরো পরিবার ও টিমমেটদের অবদান অনেক।’
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও কার্যকর পারফর্মারদের একজন হয়ে উঠেছেন ঋতুপর্ণা। জাতীয় দলে ৩৩ ম্যাচে ১৩ গোল, ২০২৪ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টুর্নামেন্টসেরা হওয়া এবং ২০২২ ও ২০২৪ সালে দলকে সাফ শিরোপা জিততে সাহায্য করার পাশাপাশি এশিয়ান কাপের মূল পর্বে পৌঁছানোর মতো ঐতিহাসিক অর্জনের নেপথ্যেও ছিল তার অবদান।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে রোকেয়া পদক পাওয়ার সুযোগ খুব কম লোকেরই হয়েছে। গত বছর দাবাড়ু রাণী হামিদ এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন; এবার সেই ধারায় যুক্ত হলো ঋতুপর্ণার নাম। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ক্রীড়াবিদরা দেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করে। একজন নারী ক্রীড়াবিদকে দেখে সমাজের আরও অনেকেই খেলাধুলায় ও নানা কাজে অনুপ্রাণিত হয়। ক্রীড়াঙ্গনে আমার মতো আরও অনেক নারী ক্রীড়াবিদ রয়েছেন। যারা আগামীতে এই পদক পেলে তারাও উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হবেন।’
তার কাছে এই পদকের মানে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি খেলোয়াড় দেশের জন্য লড়েন। সব খেলোয়াড়ই কষ্ট করে উঠে আসেন। এমন একজন ব্যক্তির নামে এমন পদক পাওয়ার পর আমার দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। এই পদকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ ও সমাজকে আরও কিছু দেওয়ার চেষ্টা করব।” এরপর তিনি যোগ করেন, ‘সব পুরস্কারই সম্মানের, তবে এই জাতীয় পুরস্কারের গুরুত্ব আলাদা। এটি দেশের নারীদের আরও প্রেরণা দেবে।’
রাঙামাটির পাহাড় থেকে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় মঞ্চ পর্যন্ত ঋতুপর্ণা চাকমার এই উত্তরণ যেন এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের প্রতীক।



